সিনেমা ‘কতটা বাজে’ সেটা দেখতে সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে দর্শকরা, নিউ লাই অ্যানিমেশন মাত্র কয়েকশ ডলারে তৈরি হয়ে চীনা বক্স অফিসে আলোড়ন তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোলের পর ছবিটির আয় ছাড়িয়েছে ৬৭ লাখ ডলার।
মাত্র কয়েকশ ডলার খরচে তৈরি একটি চীনা অ্যানিমেটেড ছবি ২০২৬ সালে বক্স অফিসে এমন আলোড়ন তুলেছে, যা বড় বাজেটের ছবির জন্যও বিরল। নিউ লাই অ্যানিমেশন নামের ছবিটি শুরুতে দর্শকের কাছে চরম দুর্বল নির্মাণশৈলীর উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল ও মিমের কারণে পরে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে শুরু করে।
চীনা বক্স অফিস ট্র্যাকার মাওয়ানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ ডলার খরচে নির্মিত ছবিটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় ছবিটির আয় প্রায় ২০ হাজার গুণ পর্যন্ত বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের সাফল্যের পেছনে প্রচলিত সিনেমা বিপণনের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোল, মিম এবং দর্শকের কৌতূহল বড় ভূমিকা রেখেছে।
‘নিউ লাই’ কীভাবে আলোচনায় এল
২০২৫ সালে চীনের অ্যানিমেটেড ছবি ‘নে ঝা ২’ বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়। প্রায় ২২৭ কোটি ডলার আয় করে এটি সর্বোচ্চ আয় করা নন-ইংলিশ ছবির রেকর্ড গড়ে।
তবে ২০২৬ সালে চীনা অ্যানিমেশনের আলোচনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি ছবি জায়গা করে নিয়েছে। ছবিটির নাম ‘নিউ লাই’, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘গরুর আগমন’।
ছবিটি কোনো বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে নির্মিত হয়নি। বরং মা-ছেলের যৌথ প্রচেষ্টায় পাঁচ বছর ধরে তৈরি হয়েছে এটি। ৩৪ বছর বয়সী শিন ইউমেং ছবিটির পরিচালক। তাঁর মা সুন লিফাংও নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।
দুজন মিলে ছবির সব চরিত্রের কণ্ঠ দিয়েছেন। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার না করে সাধারণ থ্রিডি টুলের মাধ্যমে অ্যানিমেশনটি তৈরি করা হয়েছে।
নিউ লাই অ্যানিমেশন নিয়ে কেন এত আলোচনা?

নিউ লাই অ্যানিমেশন-এর সবচেয়ে আলোচিত দিক এর অ্যানিমেশন মান। ছবির ভিজ্যুয়ালে শার্প এজ, অস্বাভাবিক এডিটিং এবং অপেশাদার কাজের ছাপ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম দেখায় এসব দুর্বলতাই ছবিটির সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই দুর্বলতাগুলোই দর্শকের আগ্রহের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির প্রথম ১০ দিনে ছবিটি মাত্র ১ হাজার ১৪০ ডলার আয় করেছিল। অর্থাৎ শুরুটা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
নেটদুনিয়ায় ট্রোল হতে হতে ছবিটি ভাইরাল হয়ে ওঠে। দর্শকদের একাংশ এটিকে এমন একটি সিনেমা হিসেবে দেখতে শুরু করেন, যেটি এতটাই খারাপ যে সেটিই দেখার আকর্ষণ তৈরি করে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক বাছুর
ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি বাছুরকে ঘিরে। সে হাঁটা শেখার চেষ্টা করছে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের একপর্যায়ে সে জ্ঞান হারায়।
এরপর স্বপ্নের মধ্যে সে একটি চিতাবাঘের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। স্বপ্নের সেই জগতে বাছুরটি নিজের গোত্রকে নেকড়ের পাল থেকে রক্ষা করার ভূমিকায় দেখা দেয়।
তবে গল্পের প্লটে অসংলগ্নতা ও নানা ধরনের গ্যাপ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু দর্শকের আগ্রহ কমেনি। বরং দুর্বল অ্যানিমেশন এবং অদ্ভুত নির্মাণশৈলীই ছবিটিকে কৌতূহলের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ব্যর্থতা থেকেই ভাইরাল হওয়ার শুরু
ছবিটির মুক্তির প্রথম দিকের ফলাফল ছিল হতাশাজনক। ১০ দিনে মাত্র ১ হাজার ১৪০ ডলার আয় করেছিল এটি। কিন্তু ছবিটির ব্যর্থতা এবং নির্মাণের অদ্ভুত মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা বাড়তে থাকে।
এরপর ট্রোল ও মিমের মাধ্যমে ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় নতুন ধরনের কৌতূহল—ছবিটি আসলে কতটা খারাপ?
এই কৌতূহলই ধীরে ধীরে বক্স অফিসে দর্শক বাড়াতে শুরু করে।
‘দ্য রুম’-এর সঙ্গে তুলনা
হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্য রুম’-এর মতো নিউ লাই অ্যানিমেশন-ও এমন একটি শ্রেণিতে জায়গা করে নিয়েছে, যেখানে ছবির দুর্বলতাই দর্শকের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
এ ধরনের সিনেমাকে অনেক সময় ‘এতই বাজে যে দেখতে ভালো লাগে’ ধরনের চলচ্চিত্র হিসেবে দেখা হয়। ‘নিউ লাই’-এর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ছবিটির নিজস্ব কোনো অফিসিয়াল পোস্টারও ছিল না। এরপর ভক্ত ও প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা নিজেরাই হাতে পোস্টার এঁকে তা হলে টাঙিয়েছেন।
ডুইনে মিম, যুক্তরাষ্ট্রেও টিকিট শেষ
চীনের শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ডুইন, যা টিকটকের চীনা সংস্করণ হিসেবে পরিচিত, সেখানে ছবিটি নিয়ে তৈরি মিম ট্রেন্ডিং হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আলোচনার প্রভাব চীনের বাইরে গিয়েও পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ছবিটির বিশেষ দুটি প্রদর্শনীর সব টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
অর্থাৎ ছবিটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনলাইন আলোচনা এবং মিম সংস্কৃতি একটি স্বল্প বাজেটের অ্যানিমেশনকে আন্তর্জাতিক কৌতূহলের বিষয় করে তুলেছে।
মাত্র কয়েকশ ডলার থেকে ৬৭ লাখ ডলার
ছবিটির নির্মাণ ব্যয় ছিল আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে মাওয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির আয় এখন প্রায় ৬৭ লাখ ডলার বা প্রায় ৮২ কোটি টাকা।
বড় বাজেটের চলচ্চিত্র যেখানে নির্মাণ ব্যয়ের বহু গুণ আয় করেও সাফল্যের হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়, সেখানে নিউ লাই অ্যানিমেশন-এর আয়-ব্যয়ের ব্যবধানই ছবিটিকে আলাদা করে তুলেছে।
তবে এই সাফল্য প্রচলিত অর্থে নির্মাণমানের প্রশংসা থেকে আসেনি। বরং দর্শকের কৌতূহল, অনলাইন ট্রোল এবং ভাইরাল কনটেন্ট ছবিটির বক্স অফিসে নতুন জীবন দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে ছবির ভাগ্য বদলে দিল
‘নিউ লাই’-এর ঘটনা দেখাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটি সিনেমার প্রচারে কতটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথম দিকে ছবিটির ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হলেও সেই নেতিবাচক আলোচনাই পরে দর্শক আকর্ষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
একজন দর্শক ছবিটি নিয়ে মজা করে পোস্ট করেছেন, আরেকজন সেটি শেয়ার করেছেন—এভাবে মিম ও ট্রোল ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর যারা ছবিটির নাম শুনেছেন, তাদের অনেকেই নিজের চোখে ছবিটির অদ্ভুত নির্মাণশৈলী দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতে শুরু করেন।
ফলে ছবির প্রচারের জন্য বড় কোনো স্টুডিও, ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপন বা তারকাবহুল প্রচারণার প্রয়োজন হয়নি।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ‘নিউ লাই’
বর্তমানে ছবিটির হল-প্রিন্ট ইউটিউবেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে চীনের বাইরেও বিভিন্ন দেশের দর্শক ছবিটি সম্পর্কে জানতে পারছেন।
তবে নিউ লাই অ্যানিমেশন-এর আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরির মূল উৎস ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ডুইনের মিম থেকে শুরু করে সান ফ্রান্সিসকোর বিশেষ প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে ছবিটি এখন একটি অস্বাভাবিক বক্স অফিস ঘটনার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
চীনের চলচ্চিত্র শিল্পে বড় বাজেটের অ্যানিমেশন যখন প্রযুক্তি ও ভিজ্যুয়াল মানের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন মাত্র কয়েকশ ডলারে তৈরি একটি অপেশাদার অ্যানিমেশনের এমন উত্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
বক্স অফিসে ‘বাজে’ সিনেমার নতুন উদাহরণ
‘নিউ লাই’-এর গল্প প্রচলিত সফলতার ধারণার সঙ্গে মেলে না। সাধারণভাবে একটি সিনেমার সাফল্যের জন্য ভালো গল্প, উন্নত নির্মাণ, প্রযুক্তি, প্রচারণা ও বড় বাজেটকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।
কিন্তু এই ছবির ক্ষেত্রে দর্শকের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত প্রচারের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ছবিটি যত বেশি ট্রোল হয়েছে, সেটি দেখার আগ্রহও তত বেড়েছে।
ফলে মাত্র কয়েকশ ডলারের নির্মাণ ব্যয় থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আয়—নিউ লাই অ্যানিমেশন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর বক্স অফিস সাফল্যের একটি আলোচিত উদাহরণ।
একটি সিনেমা কতটা ভালো বা খারাপ—তার চেয়েও কখনো কখনো দর্শকের কৌতূহল বড় হয়ে উঠতে পারে। নিউ লাই অ্যানিমেশন-এর ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। মাত্র কয়েকশ ডলারের নির্মাণ ব্যয়, পাঁচ বছরের পরিশ্রম এবং শুরুতে চরম ব্যর্থতার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোল ও মিম ছবিটিকে নতুন দর্শক এনে দিয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৬৭ লাখ ডলারের আয় করা এই অ্যানিমেশন দেখিয়ে দিয়েছে, ডিজিটাল যুগে দর্শকের আগ্রহ তৈরির পথ সবসময় প্রচলিত নিয়ম মেনে চলে না। ছবিটির অদ্ভুত নির্মাণশৈলীই শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে।





