এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (5)
ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে নতুন অধ্যাদেশ জারি
News Photocard (2)
দাম আরো কমে যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে সোনা
News Photocard (30)
এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-ফেনীসহ যেসব জায়গা থেকে ওঠা যাবে কক্সবাজারগামী ট্রেনে
News Photocard (27)
৫ প্রতিষ্ঠান থেকে এলএনজি ক্রয় প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন
News Photocard (13)
আমদানি বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, আরো সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ৯৯.৯১% কাজ শেষ, তবু ব্যয় বাড়ছে ৯০২ কোটি টাকা

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ ৯৯.৯১% শেষ হলেও বাড়ছে ৯০২ কোটি টাকা। মেয়াদ ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগে প্রকল্প নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯৯.৯১ শতাংশ। এরপরও প্রকল্পের ব্যয় আরও ৯০২ কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ফলে শুরুতে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি

দেশের এভিয়েশন খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল।

শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।

পরে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় আরও এক বছর সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এবারও প্রকল্প শেষ করার সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হবে। অর্থাৎ ছয় বছরের জন্য নেওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ প্রায় ১১ বছরে গিয়ে ঠেকবে।

৯৯.৯১ শতাংশ কাজ শেষ, তারপরও বাড়ছে ৯০২ কোটি

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯৯.৯১ শতাংশ। অর্থাৎ এক শতাংশেরও কম কাজ বাকি রয়েছে।

এই পর্যায়ে এসে বাকি কাজ শেষ করতে নতুন করে সময় ও অর্থ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বেবিচক ইতিমধ্যে প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

প্রস্তাবে আরও ৯০২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে মোট ব্যয় ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮ হাজার ৬৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

এদিকে ২০ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পের কয়েকটি প্রস্তাবিত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিন বছর পরও পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু হয়নি

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি নয়, টার্মিনাল চালু করা নিয়েও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় টার্মিনালের ‘সফট ওপেনিং’ করেন। তখন পর্যায়ক্রমে টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু এরপর প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এখন আবার চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় ‘সফট ওপেনিং’ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত।

টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেপ্টেম্বরে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অপারেটর নিয়োগে বিলম্ব, যুক্ত হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও নতুন ব্যয়ের প্রস্তাব এসেছে।

তৃতীয় সংশোধনীতে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৬৬৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অপারেটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ ব্যয় করার কথা রয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে এমন কোনো বরাদ্দ ছিল না। ফলে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে এই নতুন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি জাপানি প্রতিষ্ঠান সাব ওয়ার্কিং গ্রুপ টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছে। গত ২৫ আগস্ট বেবিচকের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেন।

এখন এসব প্রস্তাব মূল্যায়ন করে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।

অবকাঠামো ও পরামর্শক খাতেও বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব

প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে বিভিন্ন কাজের ব্যয়ও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের সিভিল ওয়ার্কসের আওতায় রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে-সংক্রান্ত অবকাঠামোর জন্য অতিরিক্ত ৬৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বিল্ডিং ওয়ার্কসে আরও ৩৭২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরামর্শক সেবার মেয়াদ ৩৫৯ জন-মাস বাড়িয়ে এর জন্য অতিরিক্ত ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে এসব ব্যয় পর্যালোচনা করে কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি।

ঠিকাদারের দাবি নিষ্পত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম বা এডিসির বিভিন্ন দাবি নিয়েও বেবিচকের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ডিসপুট বোর্ড গঠন করা হয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারের দাবির বিষয়ে বোর্ড রায় দেয়। এরপর ঠিকাদারের বিভিন্ন পাওনা নিষ্পত্তির জন্য ৭ এপ্রিল ‘অমিকেবল/গ্লোবাল সেটলমেন্ট কমিটি’ গঠন করা হয়।

কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ডিসপুট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ হাজার ৫৭৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা বকেয়া বিল এবং ৪৭ কোটি টাকা জরিমানা পরিশোধের বিষয়ও সামনে এসেছে।

প্রকল্পের নকশা, কাজের পরিধি এবং বিভিন্ন পণ্যের বিষয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্টতা ও পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত অনুযায়ী, এসব কারণেও শেষ পর্যায়ে এসে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অডিট আপত্তি

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। অডিটে অতিরিক্ত বরাদ্দ, ভ্যাট, পণ্য খালাস ও পরিবহন ব্যয়সহ একাধিক বিষয়ে আপত্তি উঠেছে।

তরল কাদামাটি শুকানোর ক্ষেত্রে দুই দফায় পরিবহন ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এনবিআরের ভ্যাটের বিপরীতে ঠিকাদারের দাবির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বন্দরে মালপত্র খালাসের ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় ঠিকাদারের পরিবর্তে রাষ্ট্রের ওপর চাপানোর বিষয়টিও অডিটে উঠে এসেছে।

এ ধরনের আর্থিক বিষয়গুলো প্রকল্পের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

কারিগরি ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন

শুধু আর্থিক বিষয় নয়, শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের কিছু কারিগরি ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন উঠেছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের মেশিনে ত্রুটি ধরা পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মেশিনগুলো পুনরায় চালু হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

টেন্ডারের সময় ইউপিএসের নির্দিষ্ট লোড ক্যালকুলেশন ও কনফিগারেশন না থাকায় ব্যাকআপ পাওয়ার ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সিস্টেমের জন্য নির্মিত ডাক্ট ব্যাংকে পানি ও কাদা ঢোকার ঘটনাও ঘটেছে। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ না করার অভিযোগও উঠেছে।

১২১টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি

প্রকল্পটির আর্থিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে ১২১টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির দুর্বলতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অসংগতির কারণে এসব আপত্তি তৈরি হওয়ার বিষয় উঠে এসেছে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বা আইএমইডি দ্রুত এসব অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছে।

ফলে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার পাশাপাশি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং আর্থিক ও কারিগরি বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে সমাধান করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের প্রত্যাশা

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল দেশের বিমান যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো প্রকল্প। এর মাধ্যমে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু নির্মাণকাজ ৯৯.৯১ শতাংশ শেষ হওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু না হওয়া এবং প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বারবার বাড়ানোর উদ্যোগ প্রশ্ন তৈরি করছে।

একই সঙ্গে অপারেটর নিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ঠিকাদারের পাওনা, অডিট আপত্তি এবং কারিগরি ত্রুটির বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী এখন পরিকল্পনা কমিশনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে কত ব্যয় অনুমোদিত হবে এবং মেয়াদ কতটা বাড়বে, তা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে স্পষ্ট হবে।

দেশের এভিয়েশন খাতের সক্ষমতা বাড়াতে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অবশিষ্ট কাজ, আর্থিক বিষয় এবং অডিট আপত্তিগুলোও যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত