আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (18)
যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে আকস্মিক বন্যা, নিখোঁজ ১৫
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (7)
যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশি মা-মেয়ে নিহত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
নেপাল-চীনে নিহত বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (18)
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম তেল চুক্তি’ ঘোষণা ট্রাম্পের
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
স্কুলে ৩ শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ১৪ বছরের সন্দেহভাজন আটক

ঝুঁকিতে হিমালয়ের ২০০ হিমবাহ হ্রদ

ঝুঁকিতে হিমালয়ের ২০০ হিমবাহ হ্রদ, নেপালে বাড়ছে উদ্বেগ, ২৬ আগস্টের বন্যা আগাম সতর্কতা ও সীমান্ত তথ্যের ঘাটতি দেখিয়েছে।

নেপালে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর হিমালয়ের উচ্চভূমিতে থাকা হিমবাহ হ্রদ ও অস্থিতিশীল বরফ-পাথরের কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের বন্যা সরাসরি প্রচলিত কোনো হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার কারণে হয়নি। বরং লেন্ডে উপত্যকার প্রায় ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

২৬ আগস্টের ওই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভাটির দিকে চিতওয়ান পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি দেখিয়েছে, হিমালয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি শুধু হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হিমবাহ ধস, তুষারধস, ভূমিধস এবং নতুন ধ্বংসাবশেষ-বাঁধযুক্ত হ্রদও আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে।

২৬ আগস্টের বন্যার পেছনে কী ঘটেছিল?

প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে, লেন্ডে উপত্যকায় বিশাল একটি হিমবাহের অংশ পাহাড় থেকে ধসে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ধসে পড়া বরফ ও পাথরের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি ঘনমিটার।

এ বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার পর পানি, পলি ও বড় পাথর প্রবল বেগে ভাটির দিকে ধাবিত হয়। স্যাটেলাইট চিত্র এবং ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্যও হিমবাহ ধসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘমেয়াদি ঢাল অস্থিতিশীলতা এবং টেকটোনিক সক্রিয়তা এ ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়।

ঘটনার দুই দিন পর ধসে পড়া উপাদান দিয়ে তৈরি একটি নতুন ধ্বংসাবশেষ-বাঁধযুক্ত হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করে। এর ফলে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় এবং ভাটির জনপদগুলোতে নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়।

হিমবাহ হ্রদ ও GLOF-এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

হিমবাহ হ্রদ থেকে সৃষ্ট বন্যার একটি পরিচিত ধরন হলো গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF। সাধারণত হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ বা মোরেইন দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে এ ধরনের বন্যা হয়।

কখনো তুষার, বরফ কিংবা শিলাধস হ্রদের পানিতে পড়ে বড় ঢেউ তৈরি করতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে। আবার বাঁধের ভেতরের বরফ গলে যাওয়া কিংবা পানির অতিরিক্ত চাপেও বাঁধ দুর্বল হতে পারে।

তবে ২৬ আগস্টের নেপালের ঘটনা ছিল আলাদা। সেখানে প্রথমে কোনো হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা সৃষ্টি হয়নি। বরং বিশাল একটি হিমবাহ সরাসরি পাহাড় থেকে উপত্যকায় ধসে পড়ে বন্যার ঢেউ তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘গ্লেসিয়ার কলাপস ফ্লাড’ বা হিমবাহ ধসজনিত বন্যা হিসেবে বর্ণনা করছেন।

অর্থাৎ, হিমবাহ হ্রদ-সম্পর্কিত দুর্যোগ এবং সরাসরি হিমবাহ ধসজনিত বন্যা আলাদা প্রক্রিয়ায় ঘটতে পারে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই উষ্ণায়নের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

উষ্ণায়নে কেন বাড়ছে হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি?

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। তুষারপাত সেই ঘাটতি পূরণ করতে না পারায় অনেক হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে। হিমবাহ পিছিয়ে গেলে তার পেছনে পড়ে থাকা পাথর, মাটি ও বরফ দিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হতে পারে।

এই বাঁধের পেছনে জমতে থাকা গলিত পানি ধীরে ধীরে বড় হ্রদে পরিণত হয়। এভারেস্টের কাছে ইমজা সো এবং মানাসলুর কাছে থুলাগি হ্রদকে এমন পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঝুঁকি শুধু পানির পরিমাণ বাড়ার কারণে তৈরি হচ্ছে না। হ্রদের আশপাশের ঢাল, পারমাফ্রস্ট এবং ঝুলন্ত হিমবাহও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে তুষারধস, ভূমিধস বা বরফধস হ্রদে আকস্মিক চাপ তৈরি করার আশঙ্কা বাড়ে।

ICIMOD-এর তথ্যও দেখায়, হিমবাহের দ্রুত গলন নতুন হ্রদ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান হ্রদের সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে, যা GLOF-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ঝুঁকিতে ২০০ হিমবাহ হ্রদ

আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা ICIMOD-এর মূল্যায়নে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদ সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উৎস প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নেপালকে কেন্দ্র করে কোশী, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকায় ৪৭টি হিমবাহ হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি নেপালে, ২৫টি তিব্বতে এবং একটি ভারতে। ICIMOD-এর প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট ইনভেন্টরিতেও এই ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হ্রদের একই দেশভিত্তিক বণ্টন পাওয়া যায়।

তবে নেপালে মোট হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা এই ৪৭টির তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন জরিপে দেশটিতে ২ হাজার ৭০ থেকে ৩ হাজারের মতো হিমবাহ হ্রদের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে ৪৭টির তালিকা মোট হ্রদের সংখ্যা নয়; বরং অগ্রাধিকার দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হ্রদগুলোর তালিকা।

নেপালের জন্য সীমান্তের ওপারের ঝুঁকিও বড়

নেপালের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটির অনেক নদীর উৎস তিব্বতে। ফলে নেপালের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কিছু হিমবাহ হ্রদ নেপালের ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত।

উৎস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত ও চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যার পুনরাবৃত্তি বেড়েছে। ফলে নেপালের জন্য শুধু নিজেদের ভূখণ্ডের হিমবাহ ও হ্রদ পর্যবেক্ষণ করাই যথেষ্ট নয়।

এ কারণে সীমান্তের ওপারে থাকা হিমবাহ হ্রদগুলোর পানি, বরফ ও পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

২৬ আগস্টের বন্যা নেপালের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।

ভোতে কোশী ও সিয়াব্রুবেসীর স্বয়ংক্রিয় নদী পরিমাপ কেন্দ্রগুলো নদীর পানি দ্রুত বাড়লে সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এবারের ঘটনায় সতর্কবার্তা দেওয়ার আগেই কেন্দ্রগুলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও একটি সমস্যা হলো, বন্যার ঢেউ অত্যন্ত দ্রুত ভাটির দিকে নেমে আসে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপালের ভূখণ্ডে প্রবেশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্যার ঢেউ সিয়াব্রুবেসিতে পৌঁছে যায়।

ফলে নদীর গেজ সচল থাকলেও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হতে পারে।

বর্তমান ব্যবস্থা মূলত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা বর্ষার বন্যার জন্য তৈরি। কিন্তু আকস্মিক হিমবাহ ধস, তুষারধস কিংবা নতুন ধ্বংসাবশেষ-বাঁধযুক্ত হ্রদ তৈরির মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনা শনাক্ত করতে এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তিব্বতের তথ্য বিনিময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নেপালের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তিব্বতের হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া।

নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় মাত্র একটি হিমবাহ হ্রদ—সিরেনম্যাকো—দুই দেশ যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু নেপালের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আরও অনেক হ্রদ তিব্বতের ভেতরে অবস্থিত।

২০২৫ সালের জুলাইয়ের রাসুয়াগড়ি বিপর্যয়ের পর ভোতে কোশীর উৎস এলাকার হিমবাহ হ্রদ নিয়ে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের অনুরোধ করেছিল নেপাল। ২০২৬ সালের মে মাসের বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যান্ডেট এখনো নেই বলে চীনা পক্ষ জানিয়েছে।

এ অবস্থায় সীমান্তের দুই পাশে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ঝুঁকি কমাতে চারটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের পানির স্তর নিয়ন্ত্রিতভাবে কমানো এবং প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আকস্মিক হিমবাহ ধস, তুষারধস এবং ধ্বংসাবশেষ-বন্যা শনাক্তের জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, তিব্বতের হিমবাহ ও হ্রদগুলোর রিয়েল-টাইম তথ্য নেপালের সঙ্গে বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

চতুর্থত, উচ্চঝুঁকির নদী উপত্যকায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও বসতি নির্মাণের নীতি পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।

ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কমানো সম্ভব

হিমালয়ের পরিবর্তনশীল পরিবেশে হিমবাহ হ্রদ বা হিমবাহ ধসের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকির পথে মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উপস্থিতি কমানো সম্ভব।

২৬ আগস্টের নেপালের বন্যা দেখিয়েছে, আকস্মিক পাহাড়ি দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রচলিত বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা যথেষ্ট নাও হতে পারে। দ্রুত হিমবাহ পরিবর্তন, নতুন হ্রদ সৃষ্টি, ঢালের অস্থিতিশীলতা এবং সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি—সবকিছুকে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

নেপালের জন্য তাই হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা, সীমান্তবর্তী তথ্য বিনিময় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো পরিকল্পনা—এই চারটি বিষয়কে একই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অংশ করা গুরুত্বপূর্ণ।

হিমালয়ের বরফ ও পানির পরিবর্তন এখন শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি নিচের নদী অববাহিকা ও জনবসতির জন্যও সম্ভাব্য দুর্যোগের বিষয়। ২৬ আগস্টের নেপালের বন্যা সেই ঝুঁকির একটি নতুন দিক সামনে এনেছে।

প্রচলিত GLOF-এর পাশাপাশি সরাসরি হিমবাহ ধসজনিত বন্যার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদগুলোর পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সীমান্তের ওপারের তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত