আরও খবর

News Photocard (18)
মালয়েশিয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতি, জরুরি অবস্থা জারি
News Photocard (9)
ফ্রান্সের উসকানিতেই সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, অভিযোগ নাইজার সরকারের
News Photocard
সুড়ঙ্গে ৯ দিন কিভাবে বেঁচে ছিলেন নেপালের দুই জলবিদ্যুৎকর্মী
News Photocard (36)
হরমুজে নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া
News Photocard (33)
মহাকাশে আরো এক ধাপ এগোল ভারত, সফল জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম ৪ বছরে সর্বোচ্চ

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম আগস্টে চার বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ ও সরবরাহ বিঘ্নে খাদ্যবাজারে নতুন মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি দেখছে এফএও।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম আগস্টে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এফএওর খাদ্যমূল্য সূচকে দেখা গেছে, জলবায়ুজনিত সংকট, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি আবারও বাড়ছে।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে খাদ্যমূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের সংশোধিত ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্টের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখনো ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর তৈরি হওয়া রেকর্ড খাদ্যমূল্যের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আগস্টের সূচক ওই রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম রয়েছে।

বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ কী

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বাজারে ঝুঁকির প্রভাব আবার ফিরে আসার সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জলবায়ুজনিত ধাক্কা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন একসঙ্গে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

আগস্টে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচকের আওতাভুক্ত সব ধরনের প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধপণ্য।

অর্থাৎ শুধু একটি নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের বাজারে নয়, বরং সূচকের আওতাধীন সব প্রধান শ্রেণির পণ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।

ইউরোপে তাপপ্রবাহ ও খরার প্রভাব

ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা ভুট্টা এবং চিনিবিটের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

একই পরিস্থিতিতে গবাদিপশুর উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, আগস্টের খাদ্যমূল্য সূচকের পরিবর্তনেও তার একটি প্রতিফলন দেখা গেছে।

শস্য ও ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে

আগস্টে এফএওর শস্য মূল্যসূচক এক মাসে ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে শস্যের মূল্যসূচক ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শুধু শস্য নয়, ভোজ্যতেলের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আগস্টে ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক ০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এটি ২০২২ সালের জুনের পর এই সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থান।

বিশ্ব খাদ্যবাজারে শস্য ও ভোজ্যতেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বাড়ায় সামগ্রিক খাদ্যমূল্য সূচকেও এর প্রভাব পড়েছে।

চিনির দামে সবচেয়ে বড় উত্থান

আগস্টে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিনির দাম। এফএওর চিনি মূল্যসূচক এক মাসে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের জুনের পর চিনির মূল্যসূচক সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।

চিনির দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে বলে জানিয়েছে এফএও। এর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ মধ্য-দক্ষিণ অঞ্চলে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ইউরোপ ও এশিয়ার আবহাওয়াজনিত উদ্বেগ।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চিনি উৎপাদনকারী অঞ্চলে উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ার আবহাওয়ার পরিস্থিতিও চিনির বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

এল নিনোর আশঙ্কায় এশিয়ার কৃষিপণ্যে অনিশ্চয়তা

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কাও বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে এশিয়ায় পাম তেল ও চিনি উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের তাপপ্রবাহ, খরা এবং অন্যান্য আবহাওয়াজনিত সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরোর বক্তব্যেও সরবরাহঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ুজনিত ধাক্কা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংকট একই সময়ে খাদ্য সরবরাহকে প্রভাবিত করলে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে—এমন সতর্কতাই তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও শস্য সরবরাহে চাপ

বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের কথা জানিয়েছে এফএও।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বাধা তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণসাগরে হামলা বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানিও কমেছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন বৈশ্বিক শস্যবাজারে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হওয়ায় এসব অঞ্চলের রপ্তানি কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। কৃষ্ণসাগর দিয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় বাধা সেই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কৃষিপণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহেও চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছে এফএও। ফলে খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জলবায়ু, যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ব খাদ্যবাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একই সময়ে সক্রিয় রয়েছে। একদিকে ইউরোপের তাপপ্রবাহ ও খরা কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা এশিয়ার পাম তেল ও চিনি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বাধা এবং রপ্তানি কমে যাওয়া। আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে কৃষিপণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

এফএওর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট—এই তিন ধরনের চাপ একসঙ্গে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসও কমাল এফএও

খাদ্যমূল্য সূচক প্রকাশের পাশাপাশি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসও কমিয়েছে এফএও।

জুলাইয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের হিসাব ৩৪ লাখ মেট্রিক টন কমানো হয়েছে। সংশোধিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ২৯৮ কোটি টন হতে পারে।

উৎপাদনের পূর্বাভাস কমে যাওয়া এবং একই সময়ে খাদ্যমূল্য সূচক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক এখনো ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর তৈরি হওয়া রেকর্ড পর্যায়ের নিচে রয়েছে। আগস্টের সূচক ওই রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম।

সামনে খাদ্যবাজারে কী ধরনের ঝুঁকি

এফএওর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যবাজারে ঝুঁকি একক কোনো কারণে তৈরি হচ্ছে না। জলবায়ুজনিত পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন—সবগুলো বিষয়ই একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ করে শস্য, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বৃদ্ধির পাশাপাশি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। ফলে খাদ্য সরবরাহ ও উৎপাদনের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এফএওর তথ্যের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিকে খাদ্যবাজারে নতুন মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি ফিরে আসার একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আগস্টের সূচক ২০২২ সালের মার্চের রেকর্ডের নিচেই রয়েছে।

আগস্টে বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার তথ্য আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসে বেড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে শস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধ—সব কটি শ্রেণির পণ্যের দাম বেড়েছে।

চিনির দামে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি শস্য উৎপাদনের বৈশ্বিক পূর্বাভাস ৩৪ লাখ মেট্রিক টন কমিয়ে ২৯৮ কোটি টন করা হয়েছে।

এফএওর সতর্কতা অনুযায়ী, জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন খাদ্যবাজারে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ও উৎপাদনের পরিস্থিতি আগামী দিনের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে।

সর্বাধিক পঠিত