মহাকাশে আরো এক ধাপ এগোল ভারত, সফল জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন, জিএসএলভি-এফ১৭ মিশনে ইওএস-০৫কে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করেছে ইসরো। ভারতের প্রথম জিওসিঙ্ক্রোনাস ইমেজিং স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণে মহাকাশে মাইলফলক তৈরি হয়েছে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন-এর মাধ্যমে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) সফলভাবে জিএসএলভি রকেট উৎক্ষেপণ করে পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ ইওএস-০৫কে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে ৪ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ৫৫ মিনিটে উৎক্ষেপণটি সম্পন্ন হয়। উৎক্ষেপণের প্রায় ১৮ মিনিট পর উপগ্রহটি সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন ছিল জিএসএলভির ১৯তম অভিযান। একই সঙ্গে ইওএস-০৫ ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট, যা জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করবে।
জিএসএলভি-এফ১৭ মিশনের সফল উৎক্ষেপণ

ইসরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মিশন সফল হওয়ার কথা জানায়। সংস্থাটি জানায়, জিএসএলভি-এফ১৭ তার নির্ধারিত দায়িত্ব সম্পন্ন করে ইওএস-০৫কে প্রয়োজনীয় কক্ষপথে স্থাপন করেছে। উৎক্ষেপণের ছবিও প্রকাশ করা হয়।
শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষেপণের পর মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যেই রকেটটি উপগ্রহকে সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে স্থাপন করে। ইসরোর প্রকাশিত তথ্যেও জিএসএলভি-এফ১৭কে ১৯তম GSLV ফ্লাইট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচিতে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির একটি নতুন ধাপ যুক্ত হলো। বিশেষ করে জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে ইমেজিং স্যাটেলাইট পরিচালনার সক্ষমতা এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইওএস-০৫ কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইওএস-০৫কে ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করবে।
উপগ্রহটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রায় তাৎক্ষণিক বা রিয়েল-টাইম ভিত্তিতে পৃথিবীর ছবি সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
ইওএস-০৫ থেকে পাওয়া তথ্য কৃষি, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন জাতীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন শুধু একটি উৎক্ষেপণ সাফল্য নয়, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসরোর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, EOS-05 একটি উন্নত পৃথিবী পর্যবেক্ষণ মহাকাশযান এবং জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট।
রকেটের সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন
ইসরোর চেয়ারম্যান ড. ভি. নারায়ণন জানান, জিএসএলভি-এফ১৭ অত্যন্ত নির্ভুলতার সঙ্গে ইওএস-০৫কে প্রয়োজনীয় কক্ষপথে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি জানান, শ্রীহরিকোটা থেকে এটি ভারতের ১০৭তম উৎক্ষেপণ এবং জিএসএলভির ১৯তম মিশন।
জিএসএলভির সক্ষমতা একদিনে তৈরি হয়নি। ইসরোর চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, রকেটটির প্রথম উৎক্ষেপণ জিএসএলভি-ডি১-এ ১ হাজার ৫৩৬ কেজি ওজনের পেলোড বহন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কাঠামোগত ওজন কমানো, প্রপালশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রকেটটির সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
এবার সেই ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে জিএসএলভি-এফ১৭ দিয়ে ২ হাজার ৩৬৭ কেজি ওজনের সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে। এই অগ্রগতি ভারতের উৎক্ষেপণ সক্ষমতার বিকাশকে তুলে ধরে।
‘আকাশের চোখ’ ইওএস-০৫
ইওএস-০৫কে বলা হচ্ছে ‘আই ইন দ্য স্কাই’ বা ‘আকাশের চোখ’। নামটির সঙ্গে উপগ্রহটির পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
উপগ্রহটি থেকে পাওয়া ছবি ও তথ্য কৃষি খাত, পরিবেশ পরিস্থিতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার ছবি পাওয়ার সক্ষমতা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কাজে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
ইসরোর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, উৎক্ষেপণের পর উপগ্রহটির বিভিন্ন ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর সব ভালভ সঠিকভাবে কাজ করছে এবং সৌর প্যানেলও সফলভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
সামনে ইওএস-০৫কে আরও উন্নত কক্ষপথে নেওয়া হবে
উৎক্ষেপণের পর ইওএস-০৫কে সরাসরি চূড়ান্ত জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে স্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে এটি সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে রয়েছে।
পরবর্তী কয়েক দিনে উপগ্রহটির কক্ষপথ আরও উন্নীত করা হবে। এরপর এটিকে প্রয়োজনীয় জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া হবে। সবশেষে জাতীয় বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জিও প্ল্যাটফর্মে উপগ্রহটি স্থাপন করা হবে।
অর্থাৎ, উৎক্ষেপণ সফল হলেও মিশনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো উপগ্রহটির কক্ষপথ সমন্বয় এবং নির্ধারিত অবস্থানে স্থাপন।
ব্যর্থ দুই মিশনের পর গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন
জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন ইসরোর জন্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ইওএস-এন১ পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ বহনকারী পিএসএলভি-সি৬২ মিশন ব্যর্থ হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ মে পিএসএলভি-সি৬১ মিশনও ব্যর্থ হয়। ফলে পরপর দুটি উৎক্ষেপণে ব্যর্থতার মুখে পড়েছিল ভারতের মহাকাশ সংস্থা।
এই পরিস্থিতির পর ইওএস-০৫কে কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করা ইসরোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে এসেছে। ইওএস-০৫ এর আগে ব্যর্থ হওয়া ইওএস-০৩ মিশনের স্থলাভিষিক্ত হবে।
ইসরোর প্রকাশিত মিশন তালিকাতেও ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের GSLV-F17/EOS-05 মিশন এবং এর আগে ১২ জানুয়ারির PSLV-C62/EOS-N1 মিশনের তথ্য রয়েছে।
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন মাইলফলক
এই জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন ভারতের মহাকাশ সক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নয়নের একটি উদাহরণ। বিশেষ করে GSLV রকেটের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৬৭ কেজি ওজনের উপগ্রহ উৎক্ষেপণ রকেটটির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনেছে।
ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, GSLV-F17 হলো GSLV সিরিজের ১৯তম ফ্লাইট। একই সঙ্গে EOS-05-এর মতো জিওসিঙ্ক্রোনাস পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ ভারতের মহাকাশভিত্তিক পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
ইসরোর চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতার ফলেই জিএসএলভির পেলোড বহনের সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। এবারের উৎক্ষেপণে সেই সক্ষমতার আরও একটি উদাহরণ দেখা গেল।
ইসরোকে অভিনন্দন জিতেন্দ্র সিংয়ের
সফল উৎক্ষেপণের পর ইসরোকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের পরমাণু শক্তি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জিএসএলভি-এফ১৭/ইওএস-০৫-এর সফল উৎক্ষেপণের জন্য ইসরোর পুরো দলকে অভিনন্দন জানান। তিনি এটিকে মহাকাশে ভারতের আরও একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
জিতেন্দ্র সিং আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের মহাকাশ সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বে মহাকাশ শক্তি হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
এখন ইওএস-০৫-এর পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে নজর থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী কয়েক দিনে উপগ্রহটির কক্ষপথ আরও উন্নীত করা হবে। এরপর নির্ধারিত জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে নিয়ে গিয়ে জাতীয় প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে স্থাপন করা হবে।
উৎক্ষেপণের পর প্রাথমিকভাবে উপগ্রহটির ভালভ, সৌর প্যানেল এবং সামগ্রিক কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাই মিশনের পরবর্তী ধাপ হবে নির্ধারিত কক্ষপথে উপগ্রহটির অবস্থান নিশ্চিত করা এবং এর পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা কাজে লাগানো।
জিএসএলভি-এফ১৭ মিশন ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উৎক্ষেপণ সক্ষমতার বিকাশ এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ—এই তিনটি দিককে একসঙ্গে সামনে এনেছে।
জিএসএলভি-এফ১৭-এর সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ইসরো আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন সম্পন্ন করেছে। ইওএস-০৫কে নির্ধারিত ট্রান্সফার অরবিটে সফলভাবে স্থাপন করা এবং পরবর্তী সময়ে এটিকে জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে নেওয়ার পরিকল্পনা ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বিশেষ করে পরপর দুটি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার পর এই সাফল্য ইসরোর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ভারতের প্রথম জিওসিঙ্ক্রোনাস ইমেজিং স্যাটেলাইট হিসেবে ইওএস-০৫ ভবিষ্যতে কৃষি, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পৃথিবী পর্যবেক্ষণ তথ্য সরবরাহ করতে পারে।





