উপজেলা নির্বাচনে পোস্টার-মিছিলসহ , শোডাউন ও এআই অপপ্রচারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলসহ ৬ মাসের শাস্তি হতে পারে।
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত গেজেটে নির্বাচন প্রচারণায় পোস্টার, মিছিল, শোডাউন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট প্রচারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নতুন উপজেলা নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত নতুন বিধিমালার গেজেট প্রকাশের পর উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণা ও নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ সামনে এসেছে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এসব বিধানের মূল লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনের আচরণবিধিতে যেসব বিষয়ে কড়াকড়ি

নতুন বিধিমালায় প্রচারণার প্রচলিত কয়েকটি পদ্ধতির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পোস্টার ব্যবহার, প্রকাশ্য মিছিল ও শোডাউন বন্ধ রাখার পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিজিটাল প্রচারণায় এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারণা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
পোস্টার ও প্রচারসামগ্রী ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধ করা। কোনো প্রার্থী বা তাঁর সমর্থক নির্বাচনী প্রচারের উদ্দেশ্যে পোস্টার ঝুলাতে বা সাঁটাতে পারবেন না।
একই সঙ্গে ভবন, দেয়াল, গাছপালা, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সেতু, কালভার্ট এবং সরকারি স্থাপনায় প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এর ফলে প্রচারণায় প্রার্থীদের প্রচলিত পোস্টারনির্ভর কার্যক্রমের পরিবর্তে বিধিমালায় অনুমোদিত অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে।
মিছিল, শোডাউন ও আকাশযানেও নিষেধাজ্ঞা
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের প্রকাশ্য মিছিল বন্ধ থাকবে। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান কিংবা ট্রেন ব্যবহার করেও মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না।
শুধু স্থল বা নৌপথের মিছিল নয়, নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টারসহ যেকোনো ধরনের আকাশযান ব্যবহারের ওপরও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে বড় ধরনের শোডাউন বা যানবাহনভিত্তিক প্রদর্শনের সুযোগ থাকছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করা যাবে, তবে শর্ত আছে
নতুন উপজেলা নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
প্রচারণা শুরু করার আগে কোন কোন প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যম ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটিও প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ফলে অনলাইন প্রচারণাকে নির্বাচনী ব্যয়ের বাইরে রাখার সুযোগ থাকছে না।
এআই দিয়ে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারে কড়াকড়ি
ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তাঁর সমর্থক নির্বাচনকেন্দ্রিক মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক বা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না।
এ ছাড়া নির্বাচনবান্ধব পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রচারণায় তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানোর বিষয়টি তাই নতুন আচরণবিধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
ভোটার প্রভাবিত করতে অর্থ, খাবার বা উপহার দেওয়া যাবে না
ভোটারদের আকৃষ্ট বা প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে অর্থ লেনদেনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। একইভাবে ভোটারদের খাবার-পানীয় পরিবেশন কিংবা উপহারসামগ্রী বিতরণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অর্থের প্রভাব কমানো এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করাও নতুন বিধিমালায় দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা নিষিদ্ধ
ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কার্যালয়ে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
একই সঙ্গে ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা বা ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক অপপ্রচারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ধর্মীয় বিষয়কে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করাই এসব বিধানের লক্ষ্য।
সরকারি সম্পদ ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা
নতুন উপজেলা নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না।
সরকারি যানবাহন, মাইক বা অন্য কোনো সরকারি সম্পত্তি প্রচারের কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনের দিন ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য কোনো ধরনের যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনী ক্যাম্প ও মাইক ব্যবহারে নির্দিষ্ট নিয়ম
প্রচারণায় নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন এবং মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে। অনুমোদিত সীমার বাইরে ক্যাম্প স্থাপন বা মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থী ও সমর্থকদের শুধু কী প্রচার করা যাবে না, সেটিই নয়; প্রচারণা কীভাবে পরিচালনা করা যাবে, সেটিও বিধিমালার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে কী শাস্তি হতে পারে?
নতুন বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো বিধি ভঙ্গ হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিধিভঙ্গের অপরাধে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
নির্ধারিত নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন, অর্থ বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করে প্রচারণা পরিচালনাকেও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইসির ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে
নতুন বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করছেন বলে মনে হলে ইসি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং অপরাধ গুরুতর হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার সুযোগও থাকবে।
এ কারণে প্রার্থী ও তাঁদের নির্বাচনী এজেন্টদের প্রচারণা, ব্যয় এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন বিধিমালা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখার লক্ষ্য
নির্বাচন কমিশনের নতুন উপজেলা নির্বাচনের আচরণবিধি মূলত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করার এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে আগে জানানো এবং অনলাইন প্রচারণার ব্যয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার, ভোটারদের অর্থ বা উপহার দিয়ে প্রভাবিত করা, ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহার বন্ধে নির্দিষ্ট নিয়ম দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে জারি করা নতুন আচরণ বিধিমালায় প্রচারণা থেকে নির্বাচনী ব্যয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পোস্টার, মিছিল, শোডাউন ও আকাশযান ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে এআই-নির্ভর অপপ্রচার ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি গুরুতর অপরাধে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ থাকায় নির্বাচনী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।





