ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান থেকে বেরিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় দুই দিন পাহাড়ে আত্মগোপনে ছিলেন মার্কিন কর্মকর্তা ‘ব্রাভো’। ৬০ মিনিটসে জানালেন বেঁচে ফেরার কাহিনি।
ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান থেকে বের হওয়ার পর প্রায় দুই দিন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা। মিশনের সাংকেতিক নাম ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ হিসেবে পরিচিত ওই কর্নেল সম্প্রতি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’-এ সাংবাদিক নোরাহ ও’ডনেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাশুট নিয়ে দ্রুত মাটির দিকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয় ১৪ সেপ্টেম্বরের ‘৬০ মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের প্রথম পর্বে। সেখানে ব্রাভো জানান, বিমান থেকে বের হওয়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর প্যারাশুটে গুরুতর সমস্যা হয়েছে। এরপর ইরানের পাহাড়ি এলাকায় অবতরণ করে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে একাই প্রায় দুই দিন টিকে থাকতে হয়।
এপ্রিলের অভিযানে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

ঘটনাটি ঘটে এপ্রিল মাসে ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক অভিযান চলার সময়। ওই অভিযানে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। বিমানটিতে ছিলেন দুই সদস্য—পাইলট ‘আলফা’ এবং অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ‘ব্রাভো’।
বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর দুজনই জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে বিমান থেকে বের হয়ে আসেন। তবে মাটিতে নামার পর তাঁরা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পাইলট আলফাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ব্রাভো ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একা পড়ে যান। সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কর্মকর্তার উদ্ধারে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানটির দুই সদস্যের জন্য পরিস্থিতি দ্রুতই কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ব্রাভোকে এমন একটি এলাকায় একা থাকতে হয়, যেখানে তিনি আহত অবস্থায় সম্ভাব্যভাবে ধরা পড়ার ঝুঁকির মধ্যেও আত্মগোপন করে ছিলেন।
ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান: প্যারাশুটে বিপদের শুরু
বিমান থেকে বের হওয়ার পরই ব্রাভো বুঝতে পারেন তাঁর প্যারাশুট ঠিকমতো কাজ করছে না। একপর্যায়ে তিনি ওপরে তাকিয়ে প্যারাশুট দেখতে পাননি।
ব্রাভোর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই মুহূর্তটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য। তাঁর ধারণা ছিল, তখন তিনি ঘণ্টায় প্রায় ৭০ থেকে ১০০ মাইল গতিতে নিচে নেমে যাচ্ছিলেন। তবে নিজের পতনের গতি নিয়ে ভাবার মতো সময় তাঁর হাতে ছিল না।
বরং তিনি প্যারাশুটের ছড়িয়ে পড়া বা আটকে থাকা অংশগুলো টেনে বের করে যতটা সম্ভব সেটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দ্রুত নিচে নামার সেই মুহূর্তে প্যারাশুট সচল রাখার চেষ্টাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রাভো জানান, প্যারাশুট নিয়ে ওই পরিস্থিতি তাঁর জন্য অত্যন্ত আতঙ্কের ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।
গুরুতর আহত অবস্থায় দুই দিন আত্মগোপন
অবতরণের পর ব্রাভোর দুর্ভোগ শেষ হয়নি। বরং শুরু হয় আরেকটি কঠিন অধ্যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রায় দুই দিন ইরানের পাহাড়ি এলাকায় একা থাকতে হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, ওই সময় তিনি ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়া এড়িয়ে চলেন। সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে তিনি পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে ছিলেন। পরে উদ্ধারকারী দল তাঁকে খুঁজে বের করে।
সিবিএসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চগতিতে মাটিতে আঘাত পাওয়ার কারণে ব্রাভোর পিঠ, একটি হাত ও একটি কাঁধে আঘাত লাগে। এত গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি প্রায় ৪৮ ঘণ্টা টিকে ছিলেন।
এই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ব্রাভো তাঁর বেঁচে যাওয়াকে একটি ‘আধুনিক দিনের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, আহত অবস্থায়ও পরিস্থিতি বুঝে আত্মগোপনে থাকা এবং নিজের সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে লাগানো তাঁর টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
‘আলফা’কে জীবন রক্ষার কৃতিত্ব দিলেন ব্রাভো
ব্রাভো শুধু নিজের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাই বলেননি, তাঁর সহকর্মী ও পাইলট ‘আলফা’র প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ব্রাভোর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন বিমান থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াই দুজনের জীবন রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ব্রাভো তাঁর পাইলট আলফার দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেছেন, বিমান থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আলফা তাঁদের দুজনের জীবন রক্ষা করেছিলেন। সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি আলফার প্রতি দীর্ঘস্থায়ী কৃতজ্ঞতার কথা জানান।
এতে বোঝা যায়, যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর মাত্র কয়েক মুহূর্তের সিদ্ধান্তই দুই সদস্যের বেঁচে থাকার সম্ভাবনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন ও উদ্ধার
বিমান থেকে বের হওয়ার পর আলফা ও ব্রাভো আলাদা এলাকায় অবতরণ করেন। পাইলট আলফাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা গেলেও ব্রাভোর অবস্থান ছিল অনেক বেশি দুর্গম।
ব্রাভোকে খুঁজে বের করতে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালাতে হয়। সিবিএসের প্রতিবেদনে এই উদ্ধার অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ও জটিল উদ্ধার অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধারে আলাদা অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং ব্রাভোর ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে চলে। পরে তাঁকে ইরান থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ব্রাভোর বর্ণনায় ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর তিনি শুধু দুর্ঘটনার ধাক্কাই সামলাননি, বরং গুরুতর আহত অবস্থায় শত্রুপক্ষের এলাকায় দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করেছেন।
প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে অভিজ্ঞতা
এতদিন ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মূলত মার্কিন সামরিক সূত্র ও উদ্ধার অভিযানসংক্রান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সামনে এসেছে। এবার ব্রাভো নিজেই তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
নোরাহ ও’ডনেলের সঙ্গে ‘৬০ মিনিটস’-এর সাক্ষাৎকারে তিনি প্যারাশুটের সমস্যা, দ্রুত নিচে পড়ে যাওয়া, পাহাড়ে অবতরণ এবং পরবর্তী সময়ে আত্মগোপনে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁকে তাঁর প্রকৃত নামের পরিবর্তে মিশনের সাংকেতিক নাম ‘ব্রাভো’ হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে।
সাক্ষাৎকারটি তাই শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এর মাধ্যমে এপ্রিলের ওই বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার কিছু নতুন বিবরণও জনসমক্ষে এসেছে।
ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান নিয়ে আরও তথ্য
ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান এবং ব্রাভোর বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা নিয়ে সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’-এর প্রতিবেদনে তাঁর নিজের বক্তব্যের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনাটির মূল দিকগুলো
- এপ্রিল মাসে ইরানের আকাশে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।
- বিমানটিতে ছিলেন পাইলট ‘আলফা’ ও অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ‘ব্রাভো’।
- দুজনই জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন।
- আলফাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
- ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাশুট নিয়ে ব্রাভো দ্রুত নিচে পড়ে যান।
- গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি প্রায় দুই দিন পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে থাকেন।
- পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
- ব্রাভো তাঁর সহকর্মী আলফাকে তাঁদের জীবন রক্ষার জন্য কৃতিত্ব দেন।
ব্রাভোর প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে উঠে আসা বিবরণে ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ে তাঁর দুই দিনের টিকে থাকার ঘটনাটি নতুনভাবে সামনে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর কয়েক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, জরুরি অবতরণ এবং পরবর্তী সময়ে আহত অবস্থায় আত্মগোপন—সব মিলিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়ার মধ্য দিয়ে ওই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।





