বাংলাদেশিদের জন্য শিক্ষার্থী ভিসায় বাড়ছে কড়াকড়ি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে কড়াকড়ি। আবেদনকারীদের নথি, অর্থ, একাডেমিক ইতিহাস ও অনলাইন কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্যের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ থেকে আবেদন নেওয়া স্থগিত করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা পরিবর্তন করে অবস্থান দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে এবং বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিবারের সদস্য নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এফ, এম ও জে শ্রেণির ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়মিত অভিবাসন, ভিসার অপব্যবহার, ভুয়া নথি এবং দুর্বল আবেদন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ এসব নিয়ম কঠোর করছে।
ফলে শুধু কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এখন আর ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, কোর্স বাছাই, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, একাডেমিক ইতিহাস, ভিসার শর্ত এবং পড়াশোনা শেষে পরিকল্পনা—সবকিছুই আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশিদের শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান কড়াকড়ি

বাংলাদেশিদের শিক্ষার্থী ভিসা নিয়ে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়ায়। নিজেদের স্পন্সর লাইসেন্স ও ভিসা-কমপ্লায়েন্স ঝুঁকি কমাতে দেশটির বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ এবং ‘কনফারমেশন অব অ্যাকসেপ্ট্যান্স ফর স্টাডিজ’ বা সিএএস দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পুরো বাংলাদেশ থেকেই আবেদন নেওয়া স্থগিত করেছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অঞ্চল, কোর্স কিংবা ডিগ্রি পর্যায়ে আবেদন সীমিত করেছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা সব প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের নয়।
সিলেটের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভর্তি বন্ধ করেছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস, অ্যাবারিস্টউইথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার, ক্যান্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটি, রিজেন্ট কলেজ লন্ডন ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটন।
এ ছাড়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা ও সিলেটের শিক্ষার্থীদের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে আবেদন বন্ধ করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান পুরো ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ না করে নির্দিষ্ট কোর্সে বিধিনিষেধ দিয়েছে।
বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি ও বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং এমরেস কোর্সে আবেদন স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। ইউনিভার্সিটি অব ডার্বি ও ইউনিভার্সিটি অব গ্রেটার ম্যানচেস্টার এমরেস ও পিএইচডি পর্যায়েও ভর্তি বন্ধ রেখেছে।
কেন যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকি কমাচ্ছে
যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ভিসা-কমপ্লায়েন্স একটি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। সংশোধিত ‘বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট’ কাঠামোয় স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে লাইসেন্স নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর আগে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ।
সরকারি গাইডলাইনেও ২০২৬ সালের জুন থেকে নতুন বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট কাঠামোয় স্পন্সরদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
উৎস প্রতিবেদনে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ২২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের স্পন্সর লাইসেন্স রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
আর্থিক নথির অসংগতি, ভিসা বা ক্রেডিবিলিটি ইন্টারভিউতে ব্যর্থতা এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর আশ্রয়ের আবেদনসহ বিভিন্ন বিষয়ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্তে বিবেচনায় আসছে বলে জানা গেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা হপিং বন্ধে কঠোরতা
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের শিক্ষার্থী ভিসা-সংক্রান্ত কড়াকড়ির পেছনে বৃহত্তর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতি কাজ করছে। দেশটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ৪৫ হাজারে এবং পরের অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে।
এই নীতির অংশ হিসেবে ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে কঠোরতা বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তুলনামূলক নিম্নমানের কোর্সে ভর্তি হয়ে বা বারবার ভিসার ধরন পরিবর্তন করে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের সময় দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ঘোষণাতেও শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকাতে ভিসা হপিং বন্ধ এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভিসায় সেকেন্ডারি আবেদনকারী, অর্থাৎ পরিবারের সদস্য যুক্ত করার সুযোগ সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের শুধু কোর্সে ভর্তি হওয়াই যথেষ্ট নয়; ভিসার শর্ত মেনে চলা এবং নির্ধারিত উদ্দেশ্যে অবস্থান করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকছে। পিএইচডি শিক্ষার্থীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবারের সদস্য নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা যাচাইয়ের আওতায় অনলাইন উপস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রে কড়াকড়ির ধরন কিছুটা আলাদা। এফ, এম ও জে শ্রেণির ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড যাচাই করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, একাডেমিক যোগ্যতা ও অর্থের উৎসের পাশাপাশি অনলাইন উপস্থিতিও ভিসা প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এফ, এম ও জে শ্রেণির শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটর ভিসা আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের আওতায় রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়সীমা নিয়েও নতুন নিয়ম আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা ও বৈধ অবস্থানের শর্ত সম্পর্কে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
ইউরোপেও বাড়ছে নিয়মকানুনের চাপ
শুধু যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত থাকার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অসুবিধার কথা জানা যাচ্ছে।
তবে বিষয়টিকে শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মনে করেন ইউরোপীয় কমিশনের ইরাসমাস প্লাস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্টস কর্মসূচির এশিয়া অঞ্চলের ব্যবস্থাপক এবং ইরাসমাস মুন্ডুস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ড. মো. আশিকুর রহমান।
কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক কড়াকড়িকে বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকানো, ভুয়া বা নিম্নমানের আবেদন যাচাই এবং বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশ নিয়ম কঠোর করছে।
বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্তে প্রস্তুতির গুরুত্ব বাড়ছে
ড. মো. আশিকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষা শেষে বিদেশে থাকার সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। তবে আগের তুলনায় সেই সুযোগ সীমিত ও প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে।
শুধু বিদেশে পড়তে গেলেই স্থায়ীভাবে সেখানে থাকা যাবে—এমন ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা বা বৈধ অভিবাসনের পথ বন্ধ হয়নি; তবে দুর্বল প্রস্তুতি এবং শুধু মাইগ্রেশনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এ কারণে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বা কোর্স নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসার নিয়ম, প্রতিষ্ঠানের ভর্তি নীতি, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং ভিসার শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভুয়া নথি নিয়ে সতর্কতা
বিদেশি দূতাবাসগুলো বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশিদের ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের বিষয়ে বারবার সতর্ক করে আসছে। আর্থিক নথি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে অসংগতি থাকলে আবেদন জটিলতায় পড়তে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ ভুয়া কাগজপত্র রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশিদের শিক্ষার্থী ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সঠিক নথিপত্রের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর ভিসা আবেদনকে আলাদা একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার থাকলেও ভিসা কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর সামগ্রিক যোগ্যতা, অর্থের উৎস, একাডেমিক ইতিহাস এবং ভিসার শর্ত পূরণের সক্ষমতা যাচাই করতে পারে।
আবেদনকারীদের জন্য পরিবর্তিত বাস্তবতা
সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো থেকে স্পষ্ট যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা এখন আগের তুলনায় বেশি প্রস্তুতি-নির্ভর হয়ে উঠছে। শুধু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা একটি ভিসা পাওয়ার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির অনেকটাই বাদ পড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই কিছু বাংলাদেশি আবেদনকারীর জন্য বিধিনিষেধ এসেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা পরিবর্তন ও পরিবারের সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের আওতা রয়েছে।
তাই আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে সঠিক তথ্য, বৈধ নথি, উপযুক্ত কোর্স নির্বাচন এবং নিজের শিক্ষাগত ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা।





