সংঘর্ষে উত্তপ্ত নেপাল, কারফিউর পরিধি বাড়াল প্রশাসন, তদন্ত কমিটি গঠন ও শান্তির আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
নেপালের সুনসারি জেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন নেপালে কারফিউ জারি করেছে এবং এর পরিধি আরও বাড়িয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর হওয়া এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় নতুন নতুন এলাকা যুক্ত করা হয়েছে। সংঘর্ষ থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা নিরাপত্তা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধান জেলা কর্মকর্তা ঈশ্বরী প্রসাদ আর্যাল মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে নতুন নির্দেশ জারি করেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই কারফিউ বহাল থাকবে।
কারফিউ চলাকালে জনসমাগম, মিছিল, সভা, সমাবেশ, বিক্ষোভ কিংবা শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচলেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নেপালে কারফিউ জারি করে সুনসারিতে নিরাপত্তা জোরদার
প্রশাসনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, ইটাহারি উপ-মহানগরীর ১৬ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মহেন্দ্র মহাসড়কসংলগ্ন এলাকাগুলো কারফিউর আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি রামধুনি পৌরসভার ১ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মহাসড়কসংলগ্ন এলাকাতেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইনারুয়া, ধুবি, ভোকরাহা নারসিংহ, কোশি, গাধি, দেওয়ানগঞ্জ, হারিনগর এবং বারজু এলাকাতেও কারফিউ কার্যকর রয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, নির্দেশ অমান্য করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও জনবহুল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সংঘর্ষের পর ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় নিষেধাজ্ঞার পরিধি
এর আগে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সুনসারি জেলার কয়েকটি সংবেদনশীল এলাকায় প্রথম দফায় কারফিউ জারি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রথম পর্যায়ের নির্দেশ অনুযায়ী, পাকালি চৌক থেকে কোশি ব্যারাজ সেতু পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়কের দুই পাশে ২০০ মিটার এলাকা কারফিউর আওতায় ছিল। একই সঙ্গে ইনারুয়া বাজারের পুরো এলাকাও বন্ধ রাখা হয়।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে প্রশাসন অতিরিক্ত পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শান্তির আহ্বান, আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিল সরকার

চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার অনুরোধ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী সংঘর্ষে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আহত সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
সরকার জানিয়েছে, সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার সব খরচ রাষ্ট্র বহন করবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন, সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ
সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, সহিংসতায় জড়িতদের ভূমিকা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করা।
সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান সরকারের
সহিংসতার পর নেপাল সরকার রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকার বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস না করার আহ্বানও জানিয়েছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, রবিবার রাতে দেওয়ানগঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভার কাপতানগঞ্জ এলাকায় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়।
পরবর্তীতে সহিংসতা জেলা সদর ইনারুয়া এবং পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়কসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মঙ্গলবার কোশি বাঁধ এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং হামলার একাধিক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর রাজধানী কাঠমান্ডুতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ মিছিল করে সহিংসতার বিচার এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে।
নেপালে কারফিউ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক নজর
নেপালের সুনসারি জেলার এই পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর রয়েছে। সংঘর্ষ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সরকারি পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখা যেতে পারে।
বিস্তারিত আন্তর্জাতিক আপডেট পেতে নেপালে কারফিউ সম্পর্কিত প্রতিবেদন পড়ুন:
সুনসারি জেলার সংঘর্ষের পর নেপাল প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারফিউ জারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন, আহতদের চিকিৎসা সহায়তা এবং শান্তি বজায় রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর নজর থাকবে। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো সহিংসতার কারণ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।





