আরও খবর

News Photocard (9)
দেশে আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনার ভরি
News Photocard (9)
দাম বেড়ে দেশের বাজারে স্বর্ণের ভরি কত?
News Photocard (9)
বাড়লো স্বর্ণের দাম, ভরিতে কত?
News Photocard (6)
৩ দফা কমার পর দাম বেড়ে যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে সোনা
News Photocard (3)
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে রেকর্ড

ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার, বিপিসির লোকসান, আন্তর্জাতিক বাজার ও পাচারের ঝুঁকি সামলাতে নতুন মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যাওয়ায় দেশে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর কথা জানানো হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য, ভর্তুকির চাপ কমানো, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো এবং জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি ঠেকাতেই এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

নতুন দামে কোন জ্বালানি কত

নতুন সিদ্ধান্তে চার ধরনের জ্বালানির দামই একসঙ্গে ২০ টাকা করে বেড়েছে। ফলে সাধারণ ভোক্তা, পরিবহন খাত এবং জ্বালানি ব্যবহারকারী অন্যান্য খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।

জ্বালানিআগের দামনতুন দামবৃদ্ধি
ডিজেল১১৫ টাকা১৩৫ টাকা২০ টাকা
কেরোসিন১৩৫ টাকা১৫৫ টাকা২০ টাকা
অকটেন১৪৫ টাকা১৬৫ টাকা২০ টাকা
পেট্রোল১৪০ টাকা১৬০ টাকা২০ টাকা

অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে যে দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছিল, নতুন ঘোষণার পর প্রতিটি পণ্যের লিটারপ্রতি মূল্য ২০ টাকা করে বেড়েছে। সরকারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয়সংক্রান্ত একাধিক নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে।

কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো

জ্বালানি বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগটির বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ ২০২৬ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এত দিন দেশে একই হারে মূল্য বাড়ানো হয়নি। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির বড় ধরনের লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ওই ছয় মাসে বিপিসির লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সম্প্রতি বিপিসির পক্ষ থেকে আমদানি-সংক্রান্ত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছে।

এপ্রিলের পরও দাম প্রায় পাঁচ মাস অপরিবর্তিত

সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলেও দেশে প্রায় পাঁচ মাস জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।

এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ বিপিসিকে বহন করতে হয়েছে। ফলে সংস্থাটির আর্থিক চাপ ক্রমেই বেড়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়েছে।

বিপিসির লোকসানের হিসাব

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে দেশের বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানও নতুন জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এসেছে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরে বর্তমানে দেশে ডিজেল বিক্রি করা হলে বিপিসির প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। এই হিসাবে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বছরে তা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

এখানে মূল বিষয়টি হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য এবং দেশের তুলনামূলক কম বিক্রয়মূল্যের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছিল। নতুন জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের মাধ্যমে সেই চাপের একটি অংশ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

পাচারের ঝুঁকিও বিবেচনায়

মূল্য সমন্বয়ের আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকির কথা জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

বিভাগটির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের দরের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দামের এই ব্যবধান পাচারের জন্য প্রণোদনা তৈরি করতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে সরকার মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, নতুন জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের মাধ্যমে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে—জ্বালানি তেল পাচার কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপিসির লোকসান হ্রাস।

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ

জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি খাতের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্তকে শুধু বিপিসির লোকসান কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না জ্বালানি বিভাগ। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং পাচারের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা

জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয়সংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে।

২০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের দাম সামঞ্জস্য করার বিষয়টি সামনে এনেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় দাম অপরিবর্তিত রাখার ফলে যে লোকসান তৈরি হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ফলে নতুন জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, বিপিসির আর্থিক ক্ষতি, আমদানি ব্যয়, পাচারের ঝুঁকি এবং ভর্তুকির চাপ—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে কাজ করেছে বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে বোঝা যায়।

সামনে জ্বালানি খাতে কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ কতটা কমে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ও ফ্রেইট চার্জের পরিস্থিতিও জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটিই বর্তমান মূল্য সমন্বয়ের অন্যতম প্রেক্ষাপট হিসেবে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়, সেটিও এই মূল্য সমন্বয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, ২০ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় চার ধরনের জ্বালানি—ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোল—লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে। সরকারের ব্যাখ্যায় এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য বিপিসির আর্থিক ক্ষতি কমানো, ভর্তুকির চাপ সামলানো, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি মোকাবিলা করা।

সর্বাধিক পঠিত