আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
সিজেপির বিক্ষোভে আবারও সহিংসতা, ৫ পুলিশ আহত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (19)
নিউ ইয়র্কে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারে আইনি সীমাবদ্ধতা, যা বললেন মামদানি
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত রাহুল–প্রিয়াঙ্কা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (15)
কানাডার পণ্যে ৫০% শুল্ক ঘোষণা ট্রাম্পের
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (29)
ইরানের কোথায় কোথায় হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

তিন শ বছরের ‘যন্তর মন্তর’ যেভাবে দিল্লির প্রতিবাদের স্থান হয়ে উঠল

তিন শ বছরের ‘যন্তর মন্তর’ যেভাবে দিল্লির প্রতিবাদের স্থান হয়ে উঠল, ১৯৯৩ সালের সিদ্ধান্ত থেকে বর্তমান সিজেপি আন্দোলনের পূর্ণ ইতিহাস জানুন।

দিল্লির যন্তর মন্তরে বর্তমানে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। এর আগে নিট বিতর্কের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী এবং ন্যায্য বিচারের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলনকারীরাও এই স্থানকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন দিল্লিতে বিক্ষোভ বা জনসমাবেশের সঙ্গে যন্তর মন্তরের নাম এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে? এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ১৯৯৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।

যন্তর মন্তরের ইতিহাস ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো

১৭২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যন্তর মন্তর। তিনশো বছরের জন্মদিনও এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে। মূলত এটি একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে এর পরিচয় বদলে যায়।

আজ যন্তর মন্তর শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনা বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্মারক নয়। দিল্লির নাগরিক আন্দোলন, প্রতিবাদ ও জনসমাবেশের অন্যতম পরিচিত স্থান হিসেবেও এটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

দিল্লিতে কোনও বড় বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি হলে অনেক সময়ই যন্তর মন্তরের নাম সামনে আসে। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে স্থানটি আলোচনায় এসেছে।

যন্তর মন্তর কীভাবে দিল্লির প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হলো

দিল্লিতে যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে নির্ধারণের পেছনে রয়েছে ১৯৯৩ সালের একটি সিদ্ধান্ত। ওই সময় সংসদের কাছাকাছি এলাকায় জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

এর ফলে নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার এবং রাজধানীর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে যন্তর মন্তর রোডকে প্রতিবাদের কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

এরপর থেকেই রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের জনসভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য জায়গাটি সহজে প্রবেশযোগ্য একটি নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বোট ক্লাব থেকে যন্তর মন্তর

১৯৯০-এর দশকের আগে দিল্লিতে প্রতিবাদের প্রধান স্থান ছিল বোট ক্লাব। সেখানে থাকা লনে বিক্ষোভকারীরা বড় ধরনের জমায়েত করতেন।

১৯৮৮ সালে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ওই বছর প্রায় ৫ লাখ কৃষক সেখানে জমায়েত করেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে আশপাশের এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

এরপর বোট ক্লাবে বড় ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। একই সময় নাগরিকদের প্রতিবাদের জন্য যন্তর মন্তরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

যন্তর মন্তর: দিল্লির প্রতিবাদের নির্ধারিত ঠিকানা

যন্তর মন্তরের অবস্থান দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে হলেও সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে এর দূরত্ব রয়েছে। ফলে এখানে প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে তৈরি হওয়া যানজট বা অন্যান্য সমস্যার সরাসরি প্রভাব ওই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে তুলনামূলকভাবে কম পড়ে।

এ কারণেই প্রশাসনের জন্যও যন্তর মন্তর একটি নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, নিজেদের দাবি ও বক্তব্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দিতে চাওয়া নাগরিকদের কাছেও স্থানটির গুরুত্ব রয়েছে।

তবে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কর্মসূচি বা বড় জমায়েতের ক্ষেত্রে কোলাহল ও যানজটের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরেও দিল্লির ওই এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের অধিকার

২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ। তবে এই অধিকার প্রয়োগ করতে হবে আইন মেনে।

ফলে যন্তর মন্তর একদিকে যেমন প্রশাসনের নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল, অন্যদিকে তেমনই নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

সিজেপি আন্দোলনের নতুন পর্ব

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার যুবকদের পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ এবং সমাজের পরজীবী হিসেবে উল্লেখ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে ১৬ মে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি গঠন করেন।

দলটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পায়। ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

এই আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবেও আবার উঠে আসে যন্তর মন্তরের নাম।

২০ জুলাইয়ের পদযাত্রা ঘিরে উত্তেজনা

২০ জুলাই, সোমবার, সিজেপির ডাকে প্রায় ২০ হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী নয়াদিল্লির সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করেন।

এই কর্মসূচিকে ঘিরে মধ্য দিল্লির পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যন্তর মন্তর ও কনট প্লেস এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড স্থাপন করে। আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে জানান, আপাতত তারা নতুন কোনো সড়ক পদযাত্রা করবেন না।

তবে এর অর্থ আন্দোলন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট ও শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।

কেন প্রতিবাদের জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ যন্তর মন্তর?

দিল্লির প্রতিবাদ রাজনীতিতে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব মূলত কয়েকটি কারণে তৈরি হয়েছে। প্রথমত, ১৯৯৩ সালের পর এটি নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয়ত, রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য জায়গাটি সহজে পৌঁছানো যায়। তৃতীয়ত, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সরাসরি আশপাশে না থাকায় বড় ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ থাকে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বহু বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রতিবাদের সঙ্গে যন্তর মন্তরের নাম যুক্ত হয়েছে। ফলে স্থানটি নিজেই দিল্লির নাগরিক প্রতিবাদের একটি পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

৩০০ বছরের ইতিহাসে বদলে যাওয়া পরিচয়

১৭২৪ সালে যন্তর মন্তর প্রতিষ্ঠার সময় এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ। তিন শতাব্দী পর সেই স্থানই দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এই পরিবর্তন যন্তর মন্তরের ইতিহাসকে আরও বহুমাত্রিক করেছে। একদিকে এটি ঐতিহাসিক জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির, অন্যদিকে আধুনিক ভারতের নাগরিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

বর্তমান সিজেপি আন্দোলন আবারও সেই পরিচয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এর দীর্ঘ ইতিহাস দেখায়, দিল্লিতে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব কোনও একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনের কারণে তৈরি হয়নি। ১৯৯৩ সালের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হতে হতে জায়গাটি রাজধানীর আন্দোলনের নির্ধারিত ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।

যন্তর মন্তরের ইতিহাস তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার ইতিহাস নয়। ১৭২৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই স্থান ১৯৯৩ সালের পর দিল্লির প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বোট ক্লাবের পরিবর্তে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তর নাগরিকদের দাবি প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে সিজেপির অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে যন্তর মন্তর। ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই স্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, সময়ের সঙ্গে কোনও ঐতিহাসিক স্থানের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় কীভাবে বদলে যেতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত