আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
অপ্রয়োজনীয় হর্ন বন্ধে ডিএমপির নির্দেশনা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (15)
বেনজীরকে ফেরত দিতে ৪ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইল দুবাই পুলিশ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (18)
ঢাকা ডুবছে চার কারণে
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
প্রবাসী কার্ডে মিলবে ১০ বিশেষ সুবিধা

সরকারের ওপর জ্বালানি ভর্তুকির বিশাল বোঝা

সরকারের ওপর জ্বালানি ভর্তুকির বিশাল বোঝা, জ্বালানি ভর্তুকি নিয়ে সরকারের চাপ বাড়ছে। বিপিসি পাঁচ দফায় ভর্তুকি চেয়েছে, আর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চলতি বছরে জ্বালানি তেলের ক্ষতি সামাল দিতে জ্বালানি বিভাগের কাছে পাঁচ দফায় চিঠি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে জুনের ২৩ তারিখ পর্যন্ত চার মাসের জন্য প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিপিসির সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সময়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নতুন করে বাড়ায় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় নতুন চাপ

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ তেলের দাম ২ দশমিক ০৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এর আগে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ৩০ এপ্রিল অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। তখন তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে জ্বালানি সংগ্রহে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।

বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ফলে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার যদি বাড়তি মূল্য সমন্বয় করতে ভর্তুকি না দেয়, তাহলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর দাম বাড়লে পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ পড়তে পারে।

জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বিপিসি

সরকারের আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল। অকটেন ও পেট্রোলের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এসব পণ্যে সামান্য ক্ষতি হলেও তা অন্যভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে বিপিসির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার ওপর ডিজেলের দাম সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, গত এক মাসে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই মাসের জ্বালানি মজুত রয়েছে।

বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম আগে ছিল ১১৪ টাকা। পরে কিছু প্রণোদনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ১০০ টাকা করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় এই দাম বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এতে প্রতি লিটারে এক টাকা করে দাম বৃদ্ধি করা হয়।

যুদ্ধ শুরুর আগে ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হতো। সে সময় বিপিসিকে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয়নি। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিপিসি এখন ধারাবাহিকভাবে সরকারের কাছে জ্বালানি ভর্তুকি চেয়ে আবেদন করছে।

পাঁচ দফা চিঠিতে ভর্তুকির দাবি

বিপিসি কর্তৃপক্ষ জ্বালানি বিভাগের কাছে পাঁচ দফায় ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ দফার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির কথা উল্লেখ করে।

এই দাবির পেছনে মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসে বিপিসির আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীতে জ্বালানি বিভাগ বরাবর আরও একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে জুনের ২৩ তারিখ পর্যন্ত চার মাসে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চাওয়া হয়।

সর্বশেষ ২ জুলাই তিন মাসের জন্য সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। পঞ্চম চিঠিটি বোর্ডের সুপারিশসহ জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছে বিপিসি।

প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা

জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসির বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ বাস্তবায়ন, ঢাকা-চট্টগ্রাম এসপিএম এবং জেট অয়েল পাইপলাইন নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা তুলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।

প্রত্যাশা ছিল, যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে সরকারের ওপর জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়ার চাপ আরও বাড়ছে।

এদিকে বিপিসির আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি আইএমএফও জানে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আইএমএফ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

জ্বালানি ভর্তুকি নিয়েও সরকারের বাড়তি চাপ

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও যুগ্মসচিব নাজনীন পারভীন বলেন, তেলের দাম বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত বিপিসির হাতে নেই। বিপিসি চলতি বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

তিনি বলেন, প্রতি মাসেই বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সুপারিশ দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্বাভাবিক নয়। ফলে ভর্তুকি দেওয়া হলেও সরকারের পক্ষে বাড়তি দামের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

নাজনীন পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সবাই চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশের বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের ১১৫ টাকা দাম এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ডিজেলের দাম বাড়লে বাড়বে মূল্যস্ফীতি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়বে। কারণ দেশের বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

তিনি আরও বলেন, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাতে অনেক সময় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্য কতটা বাড়ানো প্রয়োজন তা হিসাব করে নির্ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু সেই হিসাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যা থেকেই যাবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে সরকারকে আবার বড় অঙ্কের জ্বালানি ভর্তুকি দিতে হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় তিনি বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও পড়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি বাজারে

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মুখে রয়েছে। আবার দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, বড় অঙ্কের জ্বালানি ভর্তুকি দিলেও সরকারের আর্থিক চাপ কমবে না। কারণ আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জ্বালানি খাতে বিপিসির ক্ষতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

তাই বিশ্ববাজারে তেলের দাম, দেশের বাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ে সরাসরি চাপ তৈরি করছে। বিপিসির পাঁচ দফা চিঠিতে বড় অঙ্কের জ্বালানি ভর্তুকি চাওয়ার বিষয়টি সরকারের আর্থিক চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করছে। এর সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নতুন করে বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

সরকারকে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি এবং জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের বিষয়টিও সামাল দিতে হবে। বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর দেশের জ্বালানি বাজার ও সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে।

সর্বাধিক পঠিত