এমবাপ্পে লিভারপুলের হতে পারতেন ২০১৬ সালে। ক্লপের আগ্রহ, মায়ের পছন্দ ও অ্যানফিল্ডের টান সত্ত্বেও প্যারিস ছাড়তে চাননি তরুণ ফরাসি তারকা।
ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ২০১৬ সালে লিভারপুলের সঙ্গে চুক্তির খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে বলেন, তখন তাঁর মা চেয়েছিলেন তিনি ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে যোগ দিন। কিন্তু নিজের শহর প্যারিস ছাড়তে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি পিএসজিকে বেছে নেন। একই সময়ে তৎকালীন লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও জানিয়েছেন, এমবাপ্পেকে দলে নিতে তাঁর ক্লাব সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল।
ঘটনাটি ২০১৬ সালের। তখন মোনাকোর হয়ে নজর কাড়ছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী এমবাপ্পে। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাব তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। সেই তালিকায় ছিল লিভারপুলও।
বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেললেও সেই সময়ের সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল পিএসজিতে যাওয়া। কারণ লিভারপুলের আগ্রহ থাকলেও নিজের শহর প্যারিসে থাকার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এমবাপ্পে লিভারপুলে যাওয়ার আলোচনা কতদূর এগিয়েছিল

লিভারপুলে তখন কোচ ছিলেন জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। এমবাপ্পের মা ক্লপের বড় ভক্ত ছিলেন। সে কারণে তাঁর মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে লিভারপুলের জার্সিতে খেলুক।
আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে এমবাপ্পের মা নিজেই লিভারপুলে যান। তিনি শহর ঘুরে দেখেন, অ্যানফিল্ডে যান এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। ক্লাবের আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ হন।
অ্যানফিল্ডের পরিবেশ বোঝার জন্য তিনি একা গ্যালারিতে বসে কয়েকটি ম্যাচও দেখেন। ছেলে যদি সেখানে খেলেন, তাহলে ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের পরিবেশ কেমন হতে পারে—সেটিও তিনি কাছ থেকে অনুভব করতে চেয়েছিলেন।
লিভারপুল থেকে ফিরে তিনি এমবাপ্পেকে ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি করার জন্য উৎসাহ দেন। তবে তখন তরুণ এমবাপ্পের ভাবনা ছিল ভিন্ন।
তিনি নিজের শহর প্যারিস ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে প্রস্তুত ছিলেন না।
লিভারপুলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের পুরোনো প্রতিবেদনে ২০১৭ সালেও ক্লাবটির এমবাপ্পেকে নিয়ে আগ্রহের কথা উঠে এসেছিল, যদিও সে সময় লিভারপুল আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার খবর অস্বীকার করেছিল।
কেন প্যারিস ছাড়তে চাননি তরুণ এমবাপ্পে
এমবাপ্পের নিজের ব্যাখ্যায়, তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের শহরে থেকে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। তারকা হওয়ার আগে তিনি ফ্রান্স ছেড়ে অন্য দেশে যেতে চাননি।
এমবাপ্পে স্মৃতিচারণ করে বলেন, লিভারপুলের সঙ্গে চুক্তির আলোচনা শেষ পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছিল। তাঁর মা লিভারপুলকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন এবং চেয়েছিলেন তিনি অ্যানফিল্ডে খেলুন।
তবে মায়ের সেই ইচ্ছা তিনি গ্রহণ করেননি। কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল প্যারিসেই খেলা এবং নিজের শহরের ক্লাবের হয়ে বড় তারকা হয়ে ওঠা।
এমবাপ্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর মা তাঁকে বারবার বলতেন—লিভারপুলে গিয়ে অ্যানফিল্ডে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য অসাধারণ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাকেই অগ্রাধিকার দেন এমবাপ্পে।
এই সিদ্ধান্তই তাঁকে পিএসজির দিকে নিয়ে যায়।
আকাশে উড়তে উড়তেই চুক্তির চেষ্টা
এমবাপ্পেকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে লিভারপুলের আগ্রহ যে শুধু প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, সেটিও পরে জানা যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে ম্যাজেন্টা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ুর্গেন ক্লপ সেই সময়কার আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমবাপ্পেকে পাওয়ার জন্য লিভারপুলের পক্ষ থেকে বড় ধরনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
আলোচনাটি গোপন রাখার জন্য ব্ল্যাকপুল থেকে ফ্রান্সের নিস শহরে পাঁচ কক্ষের একটি বড় প্রাইভেট জেট পাঠানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিমানে থাকা অবস্থাতেই এমবাপ্পের পরিবারের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা।
ক্লপের বর্ণনায়, এমবাপ্পের পরিবারকে বিমানে তুলে আকাশে চক্কর দিতে দিতে চুক্তির বিষয়ে কথা হয়েছিল। সেই সময় সবাই মিলে খাবারও খেয়েছিলেন।
ক্লপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো মুহূর্তটি ছিল দারুণ। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা সফল হয়নি। এমবাপ্পে প্যারিসেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পিএসজিতে গিয়ে বদলে যায় এমবাপ্পের ক্যারিয়ার
লিভারপুলের সঙ্গে আলোচনা সফল না হওয়ার পর এমবাপ্পে পিএসজিতে যোগ দেন। শুরুতে তিনি ধারে খেলেন। পরে ১৮০ মিলিয়ন ইউরোয় তাঁর সঙ্গে চুক্তি করে পিএসজি।
প্যারিসের ক্লাবটিতে তাঁর সময় ছিল দীর্ঘ সাত বছরের। এই সময়ে এমবাপ্পে পিএসজির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
অর্থাৎ, ২০১৬ সালে নিজের শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পর তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটি তাঁকে পিএসজির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।
পিএসজির অধ্যায় শেষ করে ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এমবাপ্পে। বর্তমানে তাঁর ক্যারিয়ারের সেই পর্যায়ও তাঁকে নতুন এক অধ্যায়ে নিয়ে গেছে।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এমবাপ্পের বর্তমান অধ্যায় তাঁর ক্যারিয়ারের আলাদা গল্প হলেও, লিভারপুলে যাওয়ার সুযোগটি তাঁর ফুটবলজীবনের অন্যতম আলোচিত ‘যদি’ হয়ে রয়েছে।
মায়ের পছন্দ বনাম নিজের শহরের টান
এমবাপ্পের ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় ছিল নিজের শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তাঁর মা লিভারপুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং অ্যানফিল্ডে ছেলের খেলার সম্ভাবনা দেখতে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে এমবাপ্পে তখন প্যারিসেই নিজের পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সিদ্ধান্তটি কেবল একটি ফুটবল ক্লাব বেছে নেওয়ার বিষয় ছিল না। নিজের শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন তরুণ হিসেবে প্যারিসের ক্লাবের হয়ে বড় তারকা হওয়ার অনুভূতিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এমবাপ্পের ভাষায়, প্যারিসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন তরুণের নিজের শহরের ক্লাবেই বড় তারকা হয়ে ওঠার চেয়ে সুন্দর অনুভূতি তাঁর কাছে আর কিছু ছিল না।
এই কারণেই লিভারপুলের আগ্রহ, মায়ের পছন্দ এবং অ্যানফিল্ডের সম্ভাব্য অভিজ্ঞতার পরও শেষ সিদ্ধান্তটি হয়েছিল প্যারিসের পক্ষেই।
একটি অসম্পূর্ণ লিভারপুল অধ্যায়
এমবাপ্পে শেষ পর্যন্ত লিভারপুলের খেলোয়াড় হননি। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই আলোচনার ঘটনা তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথের কথা সামনে আনে।
একদিকে ছিল ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুল ও অ্যানফিল্ডের পরিবেশ, অন্যদিকে নিজের শহর প্যারিস এবং পিএসজি। তরুণ এমবাপ্পে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন।
পরবর্তী সময়ে পিএসজিতে সাত বছরের ক্যারিয়ারে ক্লাবটির সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া এবং ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার এগিয়ে যায়।
তবে ২০১৬ সালের সেই সময়ে যদি সিদ্ধান্তটি অন্য রকম হতো, তাহলে ফুটবলবিশ্ব হয়তো এমবাপ্পেকে ভিন্ন এক জার্সিতে দেখতে পেত। সেই সম্ভাবনার গল্পই এখন সামনে এসেছে তাঁর নিজের বক্তব্য এবং ইয়ুর্গেন ক্লপের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে।





