নতুন পে স্কেলে গ্রেড বদলালে বাড়িভাড়া কমার হিসাব, নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ, শিক্ষা ভাতা ও উচ্চতর গ্রেডে ৮ বছরের নিয়ম নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগেই এর কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হারে পার্থক্য থাকায় কিছু ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেডে গিয়েও বাড়িভাড়া কমে যাওয়ার হিসাব সামনে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন এই অসঙ্গতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
নতুন পে স্কেলে দেশের অন্যান্য এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডে বাড়িভাড়ার হার ৩৫ শতাংশ। ফলে ১৬তম গ্রেড থেকে ১৫তম গ্রেডে উন্নীত হলে মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাচ্ছে।
নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়ার হিসাব নিয়ে যে প্রশ্ন

নতুন পে স্কেলের কাঠামোতে ১৬তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। এই বেতনের ৪৫ শতাংশ হিসেবে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা।
অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ ১৬তম গ্রেডের তুলনায় মূল বেতন ৯০০ টাকা বেশি। কিন্তু ১৫তম গ্রেডে বাড়িভাড়ার হার ৩৫ শতাংশ হওয়ায় এই ভাতা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯৮০ টাকা।
ফলে হিসাব অনুযায়ী, ১৫তম গ্রেডে মূল বেতন ৯০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া কমে যাচ্ছে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা। এ কারণেই নতুন পে স্কেলে গ্রেড পরিবর্তনের পর মোট আর্থিক সুবিধার কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু মূল বেতন ও বাড়িভাড়া দিয়ে দুই গ্রেডের চূড়ান্ত মোট আর্থিক সুবিধা তুলনা করা যাবে না। কারণ একজন সরকারি কর্মচারীর মোট সুবিধার মধ্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, উৎসব, মোবাইলসহ প্রযোজ্য অন্যান্য ভাতাও থাকতে পারে। তাই প্রকৃত আর্থিক পার্থক্য নির্ধারণে পুরো বেতন-ভাতা কাঠামো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়ার হার
নতুন পে স্কেলের বাড়িভাড়া কাঠামোতে গ্রেডভেদে যে পার্থক্য রাখা হয়েছে, সেটিই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণ করায় গ্রেড উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কর্মচারীর আর্থিক সুবিধার একটি অংশ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, বেতন-ভাতার কাঠামোতে গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। তাদের মতে, বাড়িভাড়া ভাতার হার পুনর্বিবেচনা করলে এই অসামঞ্জস্য কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাংলা নববর্ষ ভাতাও কমছে
নতুন পে স্কেলে শুধু বাড়িভাড়া নয়, বাংলা নববর্ষ ভাতার হারও পরিবর্তন করা হয়েছে। বিদ্যমান কাঠামোয় মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এই ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। গেজেট অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান হারে উৎসব ও বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হবে। নতুন ১৫ শতাংশ হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের পুরো কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না হয়ে বিভিন্ন সুবিধার ক্ষেত্রে আলাদা সময়সূচি রাখা হয়েছে।
শিক্ষা সহায়ক ভাতা কত হচ্ছে
নতুন কাঠামোয় শিক্ষা সহায়ক ভাতার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মোট ১ হাজার টাকা শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যয়ের বাস্তবতায় এই অর্থ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে। তবে নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত ভাতার পরিমাণ হিসেবে প্রতি সন্তান ৫০০ টাকা এবং দুই সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার বিধানই রাখা হয়েছে।
উচ্চতর গ্রেডে অপেক্ষার সময় ১০ থেকে ৮ বছর
নতুন পে স্কেলে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জন্য ১০ বছর অপেক্ষার সুযোগ ছিল। নতুন কাঠামোয় সেই সময় কমিয়ে আট বছর করা হয়েছে।
অর্থাৎ পদোন্নতি না হলেও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে একজন কর্মচারী আট বছর পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এই উচ্চতর গ্রেডকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা হবে না।
এই পরিবর্তনটি নতুন পে স্কেলের কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ পদোন্নতির সুযোগ না থাকলেও নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় দুই বছর কমানো হয়েছে।
২০টি গ্রেডে নতুন বেতন কাঠামো
নতুন পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
১৬তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৫তম গ্রেডে তা ২২ হাজার ৮০০ টাকা। সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
তবে নতুন বেতনের পুরো সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা নতুন মূল বেতনের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ পাবেন। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই হার হবে ৪০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পুরো বেতন কার্যকর হবে।
সাভার উপজেলা নিয়ে আপত্তি
বাড়িভাড়া নির্ধারণে এলাকার শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে কর্মচারী সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, পে কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশে সাভার উপজেলাকে ব্যয়বহুল এলাকা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত গেজেটে ‘সাভার উপজেলা’র পরিবর্তে শুধু ‘সাভার পৌরসভা’ উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এর ফলে সাভার পৌরসভার বাইরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত সরকারি কর্মচারীরা বাড়িভাড়ার কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এ কারণে নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়ার এলাকার শ্রেণিবিন্যাসও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর বৈঠক
নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে করণীয় নির্ধারণে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সোমবার সারা দেশের অন্তত ১৩টি সংগঠনের নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে।
পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, দীর্ঘ সময় পর নতুন পে স্কেল পাওয়া গেলেও এতে বৈষম্য রয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের কাঠামোয় থাকা বৈষম্যের কিছু বিষয় নতুন বেতন কাঠামোতেও রয়ে গেছে, যা কর্মচারীদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর মূল দাবি হচ্ছে গ্রেডভিত্তিক বেতন ও ভাতার মধ্যে আরও সামঞ্জস্য আনা। বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার হার, শিক্ষা সহায়ক ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং ব্যয়বহুল এলাকার শ্রেণিবিন্যাস পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে তারা।
বাস্তবায়নের আগে কোন বিষয়গুলো আলোচনায়
নতুন পে স্কেলের কাঠামো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় একই সঙ্গে সামনে আসে। একদিকে ২০টি গ্রেডে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার অপেক্ষার সময় ১০ বছর থেকে আট বছরে নামিয়ে আনা এবং ধাপে ধাপে নতুন বেতন কার্যকর করার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে বাড়িভাড়ার হার গ্রেডভেদে পরিবর্তন, বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামানোর সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষা সহায়ক ভাতার নির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে কর্মচারীদের প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে ১৬তম থেকে ১৫তম গ্রেডে যাওয়ার উদাহরণটি দেখাচ্ছে, মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া কমতে পারে। তবে মোট আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা, নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগে এসব অসঙ্গতি পর্যালোচনা করে বেতন-ভাতার কাঠামোকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে।
নতুন পে স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতার কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন এসেছে। ১৬তম ও ১৫তম গ্রেডের বাড়িভাড়া হারের পার্থক্য, বাংলা নববর্ষ ভাতা কমানো, শিক্ষা সহায়ক ভাতার নির্ধারিত অঙ্ক এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় কমানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।
কর্মচারী সংগঠনগুলো যেসব অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেছে, সেগুলোর মধ্যে বাড়িভাড়া ও এলাকার শ্রেণিবিন্যাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখন নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সময়ে এসব বিষয় কীভাবে বিবেচনা করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





