বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি করে সরকার রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে নগদ সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। নতুন সিদ্ধান্তে দেশীয় সুতা ব্যবহারে মিলতে পারে বড় গতি।
বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে দেশীয় সুতা বা কাপড় ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের বিকল্প হিসেবে নগদ সহায়তার হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বস্ত্র খাতের দীর্ঘদিনের দাবির পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে দেশীয় বস্ত্রশিল্প শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠিয়েছে।
বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি কেন গুরুত্বপূর্ণ
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাকশিল্প। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাত নানা চাপের মুখে রয়েছে।

এ অবস্থায় দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নগদ সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নতুন এ প্রণোদনা স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে এবং পোশাক রপ্তানিতে নতুন গতি আনতে পারে।
কী পরিবর্তন আনছে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় ব্যবহার করলে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা পাওয়া যাবে।
এর আগে এ সহায়তার হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে বাড়তি সুবিধা পেতে রপ্তানিকারকদের দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন এই সুবিধা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
বিটিএমএর দাবির পর সিদ্ধান্ত
এ সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে বিটিএমএ নেতারা মোট ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারে উৎসাহ দিতে রপ্তানিকারকদের জন্য নগদ সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত করা।
তাদের যুক্তি ছিল, দেশীয় সুতা ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধির আগের পরিস্থিতি
অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় আড়াই বছর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো।
পরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এ সহায়তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়।
এর মাত্র ছয় মাস পর সহায়তার হার আরও কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারাবাহিক হ্রাসের কারণে দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারের হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা
নতুন সিদ্ধান্তকে বস্ত্র খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের প্রত্যাশা, নগদ সহায়তা বৃদ্ধির ফলে—
- দেশীয় সুতা ও কাপড়ের ব্যবহার বাড়বে।
- স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম আরও সক্রিয় হবে।
- তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন গতি আসবে।
- দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সামনে কী করতে হবে রপ্তানিকারকদের
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় ব্যবহারের দাবি করলেই হবে না। রপ্তানিকারকদের যথাযথ প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এ নগদ সহায়তা গ্রহণ করা যাবে।
বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর নগদ সহায়তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার মাধ্যমে দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারে নতুন উৎসাহ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এ সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, তা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।





