ট্রাম্পের নেতানিয়াহু প্রশংসা ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিরাপত্তা, সামরিক নিয়োগ ও যুদ্ধ-পরবর্তী অনিশ্চয়তা ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইওয়ার অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেছেন। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো কাজ করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সমর্থন চেয়েছেন—এমন ধারণা নাকচ করলেও তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত, হিজবুল্লাহর সঙ্গে উত্তেজনা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের মতো বিষয় নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় উঠে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে এসেছে। চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে ভোটারদের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক জোটের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ট্রাম্পের নেতানিয়াহু প্রশংসা কেন আলোচনায়?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রশংসা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো কাজ করেছেন। নেতানিয়াহুর প্রতি নিজের সমর্থন সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।
তবে ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু তাঁর কাছে সমর্থন চেয়েছেন বলে যে ধারণা রয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। অর্থাৎ, তিনি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের মূল্যায়ন করলেও নির্বাচনী সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেননি।
নির্বাচনের আগে এমন মন্তব্য রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। কারণ, নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইরানের হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ইতিবাচক মন্তব্য তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলের ভোটারদের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার ও কেন্দ্রের হিসাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলে মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশজুড়ে মোট ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৩ জন নাগরিক ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন।
ভোট গ্রহণের জন্য সারা দেশে ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সহজে প্রবেশ করা যায় এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ৬ হাজার ২০৯টি। এ ছাড়া বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন ভোটারদের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্র রয়েছে ৩ হাজার ৬২১টি।
নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক নিবন্ধিত ভোটারের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন ধরনের ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা ভোট গ্রহণের আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা থেকে প্রকৃত ভোটদানের হার বা নির্বাচনের ফল সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা, সামরিক নীতি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগও ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু
পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার মধ্যে ইসরায়েলের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দেশটি। একই সঙ্গে দক্ষিণ সীমান্তে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষও ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বক্তব্য হলো, ইরানের হুমকি মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাঁরই রয়েছে। অর্থাৎ, জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলার প্রশ্নকে তিনি নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন।
চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ইসরায়েলের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর এরিয়েল আভারবুখ।
এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নাগরিকদের কাছে দেশের নিরাপত্তা ও মানুষের সুরক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আভারবুখের বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটারদের বিবেচনায় অন্তত তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে:
জাতীয় নিরাপত্তা: চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সামরিক নিয়োগ: অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি: সংঘাতের পর দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা।
এই বিষয়গুলো নির্বাচনী বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটাররা শুধু বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতে দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে পারেন।
অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
ইসরায়েলের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ। মেজর এরিয়েল আভারবুখের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি এই বিষয়টিও ভোটারদের আলোচনায় রয়েছে।
চলমান সংঘাতের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং সামরিক দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
আভারবুখের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের নাগরিকদের উদ্বেগ কেবল যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং সংঘাতের পর পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়েও তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে এই ইস্যুতে কোন রাজনৈতিক দল কতটা সমর্থন পাবে, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোটে কারা রয়েছে?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোটে তাঁর নিজের দল লিকুদ পার্টি রয়েছে। এ ছাড়া জোটের অংশ হিসেবে রয়েছে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের বসতি স্থাপনপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের কট্টর ডানপন্থী দল জুইশ পাওয়ার।
এই দলগুলোকে নিয়ে গঠিত জোট নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভোটের ফলের ভিত্তিতে জোটের অবস্থান ও সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সামনে আসতে পারে।
নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে ইরানের হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে, ভোটারদের মধ্যে সামরিক নিয়োগ ও যুদ্ধ-পরবর্তী অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় নির্বাচনের ফল একাধিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
তবে জোটের দলগুলোর পৃথক ভোটের সম্ভাবনা বা নির্বাচনের পর তাদের আসনসংখ্যা সম্পর্কে প্রদত্ত প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই।
নির্বাচনের ফল নিয়ে কী বলছেন মেজর এরিয়েল আভারবুখ?
ইসরায়েলের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর এরিয়েল আভারবুখ মনে করেন, এবারের নির্বাচনে দুই পক্ষ প্রায় সমান ভোট পেতে পারে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আভারবুখ আরও মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে করা মন্তব্য; নির্বাচনের নিশ্চিত ফল নয়।
ভোটের ফলের ওপর নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমীকরণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান কম হলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
নির্বাচনের আগে জাতীয় নিরাপত্তা, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের কারণে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোন দিকে যায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও নির্বাচনী প্রচারের তাৎপর্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি ইতিবাচক মূল্যায়ন প্রকাশ পেয়েছে। তবে নেতানিয়াহু তাঁর কাছে নির্বাচনী সমর্থন চেয়েছেন বলে যে ধারণা রয়েছে, ট্রাম্প তা নাকচ করেছেন। এই দুই বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রশংসা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব পেলেও নির্বাচনে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর। একইভাবে, নিরাপত্তা নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য কতটা সমর্থন পায়, তা নির্ধারণেও ভোটের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইসরায়েলের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্বাচনের ফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ভোটের প্রকৃত ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
ইসরায়েলের নির্বাচন: এখন নজর যেসব বিষয়ে
এই নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, চলমান সংঘাতের মধ্যে ভোটাররা জাতীয় নিরাপত্তাকে কতটা অগ্রাধিকার দেন। দ্বিতীয়ত, অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ভোটারদের পছন্দকে কোন দিকে নিয়ে যায়।
এর পাশাপাশি নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, তাঁর রাজনৈতিক জোটের অবস্থান এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
মেজর এরিয়েল আভারবুখের মূল্যায়নে দুই পক্ষের কাছাকাছি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভোটের প্রকৃত ফল না আসা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার নির্বাচন বা নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক নীতি এবং সংঘাত-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোটারদের মনোভাব বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।





