১৫৯ গ্যাংয়ে কাঁপছে ঢাকা, কিশোর গ্যাং নিয়ে ডিএমপির তথ্য প্রকাশ। রাজধানীতে সক্রিয় ১৫৯টি গ্যাং ও অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ জানুন।
রাজধানীতে ঢাকার কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আট বিভাগে বর্তমানে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক নজরদারির অভাব, মাদকাসক্তি, আর্থিক সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অপরাধকে ‘হিরোইজম’ হিসেবে দেখার প্রবণতার কারণে অনেক কিশোর অপরাধী চক্রে যুক্ত হচ্ছে।
গত এক বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিএমপির তথ্য বলছে, গত বছর সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৯টিতে।
ঢাকার কিশোর গ্যাং: ডিএমপির আট বিভাগে সক্রিয় ১৫৯ চক্র

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে তেজগাঁও বিভাগে। এখানে সক্রিয় রয়েছে ৪০টি গ্যাং।
এরপর রয়েছে মিরপুর বিভাগ, যেখানে রয়েছে ৩৫টি কিশোর গ্যাং। এছাড়া ওয়ারী বিভাগে ২০টি, মতিঝিলে ১৬টি, উত্তরা বিভাগে ১৫টি, রমনায় ১২টি, গুলশানে ১১টি এবং লালবাগ বিভাগে ১০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এর সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক কারণও জড়িত।
মোহাম্মদপুরে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং
ডিএমপির থানাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই এলাকায় ২৭টি গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
মোহাম্মদপুর দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, অস্ত্র প্রদর্শন এবং বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে আলোচনায় রয়েছে। এসব অপরাধে সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে।
মোহাম্মদপুরের সক্রিয় গ্যাংগুলোর মধ্যে রয়েছে—পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল গ্রুপ, ঘুটা দে, লারা দে, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ, মাহি গ্রুপ, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, চার্লি গ্রুপ ও বেলচা মনির গ্রুপ।
এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৪৮১ জন বলে তথ্য রয়েছে। জমি দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও সংঘর্ষের মতো অপরাধে তাদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানা সূত্র জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের ও উদ্বাস্তু পরিবারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক কিশোর সহজেই এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
পল্লবীতে সক্রিয় ১৬ কিশোর গ্যাং
ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, পল্লবী এলাকায় ১৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এসব গ্যাংয়ের মধ্যে রয়েছে আশিক গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা হারুনের ভাই ভাই গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপ।
তথ্য অনুযায়ী, আশিক গ্রুপে ২৫ জন সদস্য থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাস্তবে এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এছাড়া ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপে পেশাদার অপরাধীদের ২০ জন সদস্য রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
উত্তরায় আবারও সক্রিয় হচ্ছে গ্যাং সংস্কৃতি
উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারির একটি ঘটনার পর। ওই সময় ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে স্কুলছাত্র আদনান কবির নিহত হন।
ঘটনার পর প্রশাসন কিশোর গ্যাং দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। তবে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উত্তরা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব
রাজধানীর প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত যাত্রাবাড়ী এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে।
অতীতে ভোল্টেজ গ্রুপ, দে-দৌড় গ্রুপ ও হ্যাঁচকা টান গ্রুপের মতো বিভিন্ন গ্যাংয়ের উত্থান দেখা গেছে। বর্তমানে এলাকায় কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ীতে পলাশ গ্রুপে ১২ জন, ফাহিম গ্রুপে ২১ জন, লিটন গ্রুপে ২৫ জন, ওয়ালিদ গ্রুপে ১৫ জন, আহনাফ গ্রুপে ১২ জন, জীবন গ্রুপে ২২ জন, শুভ-জাহিদ গ্রুপে ১৮ জন এবং সাকিব গ্রুপে ১৬ জন সদস্য রয়েছে।
এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে চাপাতি, রামদা ও সামুরাই নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কিশোররা কেন গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার কিশোর গ্যাং বিস্তারের পেছনে একাধিক সামাজিক কারণ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- পরিবারের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব
- আর্থিক সংকট
- কর্মসংস্থানের সংকট
- মাদকাসক্তি
- প্রযুক্তির অপব্যবহার
- অপরাধের মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করার চেষ্টা
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধান করা কঠিন। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক দায়িত্বশীলতা এবং পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ।
অপরাধ দমনে প্রয়োজন সংশোধনমূলক ব্যবস্থা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, কিশোরদের গ্যাংয়ে যুক্ত করার পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে বা বড় ভাই হিসেবে ভূমিকা রাখে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে কিশোরদের ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রিভেনশন পুলিশিংয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হলেও অপরাধের কারণ আগে শনাক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, কোন এলাকায় কী কারণে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে এবং কিশোররা কোন প্ররোচনায় অপরাধে জড়াচ্ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধমূলক পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে।
ডিএমপির পদক্ষেপ
ডিএমপির সদর দপ্তরের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানান, কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, নিয়মিত ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তালিকা অনুযায়ী কিশোর গ্যাং সদস্যদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সন্তানদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার বিষয়ে বোঝানো হচ্ছে।
রাজধানীতে ঢাকার কিশোর গ্যাং এখন একটি বড় সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।





