চট্টগ্রাম কাস্টমসে গতি আসছে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় নতুন আশ্বাস দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আইসিডি কোড-৩০৬ চালু ও সংস্কার উদ্যোগে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বড় গতি আসার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রক্রিয়ায় গতি আনতে চট্টগ্রাম কাস্টমসে রপ্তানি সহজীকরণ নিয়ে বড় ধরনের সংস্কার ও আধুনিকায়নের আশ্বাস দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস, আইসিডি কাস্টমস ও কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। সোমবার (২০ এপ্রিল) চট্টগ্রামে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এ আশ্বাস দেওয়া হয়। মূল লক্ষ্য—রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, ব্যয় কমানো এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
চট্টগ্রামে কাস্টমস-বিজিএমইএ বৈঠকে রপ্তানি প্রক্রিয়া নিয়ে জোর আলোচনা

বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কাস্টমস সেবাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। বিশেষ করে আইসিডি বা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো পর্যায়ে সরাসরি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স চালুর ওপর তারা গুরুত্ব দেন।
তাদের মতে, এ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের জটিলতা কমবে, পণ্যের ছাড়পত্র দ্রুত পাওয়া যাবে এবং সময় ও পরিচালন ব্যয় কমবে।
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করেন আইসিডি কাস্টমস হাউজের কমিশনার আবু বাশার মো. শফিকুর রহমান, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিন এবং কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার জাকির হোসেনের সঙ্গে।
বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী, পরিচালক ফয়সাল সামাদ, এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, এনামুল আজিজ চৌধুরী এবং সাবেক পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে রপ্তানি সহজীকরণে আইসিডি কার্যক্রমের গুরুত্ব
রপ্তানি সংশ্লিষ্ট জট কমাতে আইসিডি কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেন বিজিএমইএ নেতারা।
আইসিডি বাস্তবায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিজিএমইএ-এর ভারপ্রাপ্ত প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী বলেন, আইসিডি পর্যায়ের কার্যক্রম কার্যকর হলে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং রপ্তানি অবকাঠামোর দক্ষতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আইসিডি পর্যায়ে সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি-রপ্তানিতে বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছিল। এসব সমস্যা সমাধানে শিল্পবান্ধব নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
আইসিডি কোড-৩০৬ চালুর প্রস্তুতি
বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির তথ্য দেন আইসিডি কাস্টমস কমিশনার আবু বাশার মো. শফিকুর রহমান।
তিনি জানান, আইসিডি নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হবে।
তিনি আরও বলেন, ১ জুন থেকে আইসিডি কোড-৩০৬ চালুর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অবহিত করা হবে।
এই ঘোষণা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি বাস্তবায়িত হলে কার্যক্রমে কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে।
কাস্টমস প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিন বলেন, কাস্টমস হাউজ থেকে আইসিডি কার্যক্রম পৃথক হওয়ার ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে।
তার মতে, এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার হবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গতি আসবে।
এ ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসকে অনেকেই রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছেন।
বন্ড কমিশনারেটের সমন্বয় বাড়ানোর আশ্বাস
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, বন্ড ও বিজিএমইএ-এর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা হবে, যাতে উদ্ভূত যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, লক্ষ্য হচ্ছে রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং শিল্পখাতকে কার্যকর সহায়তা দেওয়া।
রপ্তানি প্রতিযোগিতায় নতুন বার্তা
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা কাস্টমস নীতিমালার আধুনিকায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে—এ বাস্তবতায় তারা মনে করেন, রপ্তানি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সময় কমানো এখন কৌশলগত প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে রপ্তানি সহজীকরণ উদ্যোগ সেই প্রেক্ষাপটে শিল্পখাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উঠে এসেছে।
শিল্পখাত কী প্রত্যাশা করছে
রপ্তানিকারকদের প্রত্যাশা, ঘোষণাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে যাবে এবং আইসিডি-কেন্দ্রিক সংস্কার কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কমবে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত, সেখানে দ্রুত কাস্টমস সেবা প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
সোমবারের বৈঠকগুলোতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যে আশ্বাস দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের গতি এখন হবে মূল বিষয়। আইসিডি কোড-৩০৬ চালু, নীতিমালা অনুমোদন, প্রশাসনিক পৃথকীকরণ এবং সমন্বয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর হলে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণে, এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়—এটি রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিরও অংশ।




