এইমাত্র

আরও খবর

Shikor Web Image (77)
চট্টগ্রাম কাস্টমসে গতি আসছে রপ্তানি প্রক্রিয়ায়: সহজীকরণের আশ্বাস বিজিএমইএকে
Shikor Web Image (71)
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী
Shikor Web Image (68)
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে বিএনপি সরকারের সমঝোতা হয়নি: সংসদে অর্থমন্ত্রী
Shikor Web Image (76)
১৫ এপ্রিলের মধ্যে এলএনজি-এলপিজি নিয়ে আসছে আরও ৫ জাহাজ
Shikor Web Image (72)
দেশে আজ কত দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা

রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ধস: ৯ মাসেই ঘাটতি ৯৮ হাজার কোটি টাকা

রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ধস রাজস্ব আদায় ঘাটতি ৯ মাসে পৌঁছেছে ৯৮ হাজার কোটি টাকায়। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কে বড় ঘাটতির কারণ, এনবিআরের ব্যাখ্যা ও অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা জানুন।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশের রাজস্ব আদায় ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নতুন রাজস্ব খাত খুঁজে না পেলে ঋণনির্ভরতা বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ আরও গভীর হবে।

গত অর্থবছরের পুরো সময়ের রেকর্ড ঘাটতিও ছাড়িয়ে গেছে চলতি সময়ের এই ঘাটতি। যদিও একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবু বিশাল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রাজস্ব আদায় ঘাটতি ৯৮ হাজার কোটি: কী বলছে এনবিআর

মঙ্গলবার প্রকাশিত এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আয়কর, আমদানি শুল্ক এবং মূসক খাত থেকে মোট আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা।

এটি শুধু চলতি অর্থবছরের জন্যই বড় ধাক্কা নয়, বরং গত অর্থবছরের ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। আগের রেকর্ডের চেয়ে এই ঘাটতি ৫ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা বেশি।

একক মাস হিসেবে মার্চেও রাজস্ব আদায়ে বড় পিছিয়ে পড়ার চিত্র দেখা গেছে। ওই মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। আগের বছরের মার্চের তুলনায় প্রবৃদ্ধিও ছিল মাত্র ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

আয়কর খাতেই সবচেয়ে বড় সংকট

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে আয়কর খাতে।

৯ মাসে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কর প্রশাসন, করপালন এবং সংগ্রহ দক্ষতার বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

ভ্যাট ও কাস্টমসেও বড় ঘাটতি

ভ্যাট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কাস্টমস অনুবিভাগে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। এখানে ঘাটতি ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা।

এই তিন প্রধান উৎসেই ঘাটতির কারণে সামগ্রিক রাজস্ব আদায় ঘাটতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করছেন, বড় রাজস্ব ঘাটতি নিয়েই নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তার ভাষায়, রাজস্ব বাড়াতে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চললে হবে না, নতুনভাবে ভাবতে হবে।

তিনি বলেন, করদাতারা যে পরিমাণ কর দেন, তার শতভাগ যেন সরকারি কোষাগারে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন কর খাত খোঁজার ওপর জোর দেন তিনি।

উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কর এবং সম্পদ কর আরোপের এনবিআরের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেন এই অর্থনীতিবিদ।

তার মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত না হলে সরকার বড় ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ বাজেটে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়াবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান যা বললেন

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এত বড় ব্যবধান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে কঠিন করে তুলেছে।

তার মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, কয়েকটি ব্যাংকের দুরবস্থা, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে থাকা এবং অর্থ পাচারের মতো বিষয়গুলো রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক বড় করদাতা দেশ ছেড়েছেন, যা কর সংগ্রহে প্রভাব ফেলছে।

তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেন।

রাজস্ব আদায় ঘাটতি কেন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব কম আদায় মানে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে চাপ বাড়া।

সরকার তখন ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এতে একদিকে ঋণের সুদ ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাজস্ব কাঠামো দুর্বল হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও প্রভাব পড়ে—এমন মত অর্থনীতিবিদদের।

করজাল সম্প্রসারণ কি হতে পারে সমাধান

বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, নতুন করদাতা যুক্ত করা ছাড়া সংকট কাটানো কঠিন।

করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল মনিটরিং, কর ফাঁকি রোধ এবং স্বচ্ছ সংগ্রহ ব্যবস্থা ছাড়া রাজস্ব আদায় ঘাটতি কমানো সম্ভব নয়।

এছাড়া অর্থনীতির মন্থরতা কাটিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোও রাজস্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

নতুন অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে এই ঘাটতি সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

একদিকে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, অন্যদিকে সংগ্রহে বড় ঘাটতি—এই দ্বৈত চাপ নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও সংস্কার দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

সর্বাধিক পঠিত