ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ : স্কুলগুলোর অবস্থা কতটা জরাজীর্ণ, বড় ক্লাস, শিক্ষক সংকট ও বৈষম্যের চিত্র। জানুন সংকটের প্রধান কারণগুলো।
ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে দেশটিতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্র বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শত শত উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। শিক্ষার্থীরা বলছে, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট ও অর্থের ঘাটতি তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে ‘যৌক্তিক’ বলে স্বীকার করেছেন এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, জরাজীর্ণ ভবন ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ফ্রান্সের স্কুল পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নটি তাই শুধু ভবনের অবস্থা বা শিক্ষক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, শহর ও গ্রামের পার্থক্য, দীর্ঘ স্কুল সময় এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতির মতো একাধিক সমস্যা।
ফ্রান্সের স্কুল পরিস্থিতিতে সামাজিক বৈষম্যের প্রভাব

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্রান্সে সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও এলাকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় কম।
ওইসিডির ফরাসি শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়ের বলেছেন, সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ফলাফলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তার ব্যাখ্যায়, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাই প্রায়ই সুবিধাবঞ্চিত স্কুলে পড়াশোনা করে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক সংগঠন ও সমাজবিজ্ঞানীদের বক্তব্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। তাদের মতে, একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফল অনেকাংশে পরিবারের আর্থিক অবস্থা, বসবাসের এলাকা এবং সামাজিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করতে পারে।
অর্থাৎ, শিশুটি কোথায় জন্মেছে এবং কোন এলাকায় বেড়ে উঠছে, সেটিও তার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
জরাজীর্ণ ভবন ও খারাপ অবকাঠামো
ফ্রান্সের সব উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থা একই নয়। তবে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দেশটির কিছু শহর ও নিম্নআয়ের উপশহরের স্কুল ভবনের গুরুতর অব্যবস্থাপনার কথা উঠে এসেছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধারণ করা ভিডিওতে কোথাও ছাদ থেকে পানি চুঁইয়ে পড়া, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রব এবং কোথাও দেয়াল ও ছাদে গর্তের চিত্র দেখা গেছে। কিছু স্কুলের শৌচাগারও ভাঙা। এমনকি পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল না থাকায় শিক্ষকদের এক শ্রেণিকক্ষ থেকে অন্য শ্রেণিকক্ষে আসবাব বহন করতে হচ্ছে।
কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ছাদ দিয়ে পানি পড়ার সময়ও তাদের ক্লাস করতে হয়েছে। পানি এড়াতে কোথাও কোথাও ডেস্ক সরিয়ে নিয়ে পাঠদান চালাতে হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাপপ্রবাহের সমস্যা। গত মে ও জুন মাসে অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায়। ফলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে ক্লাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের হাজার হাজার স্কুল ভবনের মেরামত ও সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত বহু পুরোনো ভবনও রয়েছে।
উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিভিন্ন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে পুরোনো ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।
ফরাসি সিনেটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে স্কুল ভবনের সংস্কার ও মেরামতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।
শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী আরেক বড় সমস্যা
ফ্রান্সের স্কুল পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রেণিকক্ষের আকার। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে একেকটি ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
ওইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়েরের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে একটি ভাষার ক্লাসে গড়ে ২৯ জন শিক্ষার্থী থাকে। ওইসিডিভুক্ত অন্যান্য দেশে এই গড় সংখ্যা ২৬ জন।
তবে জাতীয় গড়ের আড়ালে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। প্যারিস ও আশপাশের এলাকার অনেক উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি ক্লাসে ৩৬ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী থাকে। বিপরীতে গ্রামীণ এলাকার স্কুলে একই শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম।
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির স্কুলগুলোতে শ্রেণিকক্ষের আকার আরও বড় হয়েছে। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর চাপ বাড়ার বিষয়টিও বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ স্কুল সময় ও জটিল সময়সূচি
শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ হলো দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকা। ওইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়েরের মতে, ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা ওইসিডিভুক্ত বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বছরে বেশি সময় শ্রেণিকক্ষে কাটায়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—দুই স্তরেই এই প্রবণতা দেখা যায়। তবে ফ্রান্সে বছরে স্কুল খোলা থাকে ৩৬ সপ্তাহ, যা ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর গড়ের তুলনায় কম। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম সপ্তাহের মধ্যে বেশি ক্লাস করানো হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, অনেক স্কুলে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্লাস চলে। দিনের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি থাকায় স্কুলে অবস্থানের সময় আরও বেড়ে যায়।
শিক্ষকদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। এর ফলে ক্লাসের সময়সূচি তৈরি করাও আরও জটিল হয়েছে।
ফরাসি সরকার স্কুলের দৈনিক সময়সূচি এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলে থাকার সময় পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শিক্ষক সংকট ও অনুপস্থিতির প্রভাব
শিক্ষক সংকট ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে সবসময় তার জায়গায় নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয়।
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কারণে সারা বছর প্রায় ১০ শতাংশ নির্ধারিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। মন্ত্রণালয়ও সমস্যাটিকে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।
শিক্ষক ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউর হিসাবে, চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ফ্রান্সের অর্ধেকের বেশি সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্তত একজন শিক্ষকের ঘাটতি ছিল।
বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিম্নআয়ের এলাকার স্কুলগুলোতে অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় নতুন শিক্ষক পাওয়া আরও কঠিন।
গত বছর ফরাসি পার্লামেন্টে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস আঁসুমিজ’-এর এমপি বাস্তিয়েন লাশো। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, প্যারিসের বাইরে তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা সেন-সাঁ-দেনির শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত শিক্ষকদের কারণে মোট ক্লাসের ২০ শতাংশ পর্যন্ত হারাচ্ছে—এমন একটি হিসাব সরকার নিশ্চিত করতে পারে কি না।
এই হিসাবটি ২০১৯ সালে অভিভাবকদের সংগঠন এফসিপিই প্রকাশ করেছিল। সংগঠনটির দাবি ছিল, এর ফলে একজন শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবনে প্রায় এক বছরের সমপরিমাণ ক্লাস নষ্ট হতে পারে। তবে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই হিসাব নিশ্চিত করেনি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক ইউনিয়নগুলোর মতে, শুধু শিক্ষক নয়, স্কুল নার্স এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তাকারী কর্মীসহ অন্যান্য অশিক্ষক কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।
ফ্রান্স কি শিক্ষা খাতে কম অর্থ ব্যয় করছে?
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতির অভিযোগ উঠলেও চিত্রটি কিছুটা জটিল। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রান্স অনেক দেশের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করে।
তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো—এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে শিক্ষার্থীরা কতটা ভালো ফল পাচ্ছে।
ওইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়েরের মতে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় ফ্রান্সের ব্যয় ওইসিডির গড়ের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি। বিপরীতে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকসহ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে ফ্রান্সের ব্যয় ওইসিডির গড়ের চেয়ে ১১ শতাংশ কম।
উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে বেশি ব্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেশটির বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকের মতে, এসব কর্মসূচির অনেকগুলো ফ্রান্সের ভেতরেই যথেষ্ট স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন পায় না।
একই সঙ্গে শিক্ষকদের চাকরির মাঝামাঝি ও শেষ পর্যায়ের বেতনও তুলনামূলকভাবে কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভের পেছনে একাধিক সংকট
সব দিক বিবেচনায় ফ্রান্সের স্কুল পরিস্থিতি একটি একক সমস্যার ফল নয়। জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতি, দীর্ঘ স্কুল সময় এবং সামাজিক বৈষম্য—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে শিক্ষক সংগঠন, সমাজবিজ্ঞানী এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে ‘যৌক্তিক’ বলে স্বীকার করা এবং অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষের আকার, শিক্ষক কর্মঘণ্টা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরে।
অন্যদিকে, শিক্ষা খাতে ফ্রান্সের ব্যয় অনেক দেশের তুলনায় বেশি হলেও সেই অর্থের ব্যবহার এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে চলমান ছাত্র বিক্ষোভ শুধু তাৎক্ষণিক অবকাঠামোগত সংস্কারের দাবি নয়; এর মধ্য দিয়ে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সামনে এসেছে।





