নেতানিয়াহু তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করছে কি না খতিয়ে দেখে তথ্য চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ। আইসিসির পরোয়ানা ও কূটনৈতিক অনুমতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গেলে তাঁর বিমান কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করবে কি না, তা খতিয়ে দেখছে অটোয়া। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে সিটিভি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তথ্য দিতে তিনি তাঁর দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিষয়টি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগে জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহু কানাডায় প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। ফলে সরাসরি কানাডায় প্রবেশ না করে দেশটির আকাশসীমা ব্যবহার করার সম্ভাবনাও এখন কূটনৈতিক ও আইনি আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার নিয়ে কী বললেন আনিতা আনন্দ

আনিতা আনন্দ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উড্ডয়ন বা ‘ফ্লাইওভার’ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি ইতিমধ্যে তাঁর মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জাতিসংঘে আসার আগে এই নির্দিষ্ট উড্ডয়ন সম্পর্কে তাঁর কাছে তথ্য ছিল না।
এতে বোঝা যায়, কানাডা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে তথ্য যাচাই করছে। তবে নেতানিয়াহুর বিমান শেষ পর্যন্ত কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করবে কি না বা এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে আনিতা আনন্দ কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার প্রসঙ্গটি মূলত দুটি বিষয়কে সামনে এনেছে—কানাডার আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তের প্রতি অবস্থান এবং বিদেশি রাষ্ট্রীয় বিমানের জন্য বিদ্যমান কূটনৈতিক অনুমোদন প্রক্রিয়া।
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নেতানিয়াহুকে দেখে কি কানাডা?
সাক্ষাৎকারে আনিতা আনন্দকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, কানাডা নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে কি না। তিনি এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।
এর পরিবর্তে কানাডার অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দেশটি আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর সিদ্ধান্তকে সম্মান করে। একই সঙ্গে গাজা, ফিলিস্তিন ও পশ্চিম তীরসহ দুর্ভোগে থাকা মানুষের পাশে থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আনিতা আনন্দের বক্তব্য অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মূল্যায়নের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত ও মানবিক পরিস্থিতির প্রতি কানাডার অবস্থানের কথা গুরুত্ব পেয়েছে।
কানাডার আকাশসীমা ব্যবহারে কী নিয়ম আছে
বিদেশি কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথি রাষ্ট্রীয় বিমানে ভ্রমণ করলে কানাডার আকাশসীমায় প্রবেশের আগে কূটনৈতিক অনুমতির প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অনুমতির জন্য অটোয়ার কাছে অন্তত তিন কর্মদিবস আগে আবেদন করতে হয়।
এই নিয়মের কারণে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য যাত্রাপথ সম্পর্কে কানাডার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকার কথা। তবে নির্দিষ্ট এই উড্ডয়ন সম্পর্কে আনিতা আনন্দ তাঁর দপ্তরের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এখানে আকাশসীমা ব্যবহার এবং কানাডার ভূখণ্ডে প্রবেশ—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আকাশসীমা অতিক্রম করা সরাসরি কানাডার ভূখণ্ডে প্রবেশের সমান নয়। তবে রাষ্ট্রীয় বিমানের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক অনুমোদনসংক্রান্ত নিয়ম থাকায় বিষয়টি কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে।
আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য কানাডা-সংক্রান্ত যাত্রাপথ আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ হলো তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
আইসিসির নথি অনুযায়ী, ২১ নভেম্বর ২০২৪ আদালত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের কার্যক্রমটি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে করা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আইসিসির নথিতে আদালতের ওই সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে। একই বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও পরোয়ানাগুলো প্রত্যাহার বা বাতিলের আবেদনসহ আইনি আপত্তি জানানো হয়েছিল।
অর্থাৎ, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রমের অংশ।
নেতানিয়াহুর কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার—আইসিসির নথি
মার্ক কার্নির আগের বক্তব্য
নেতানিয়াহুকে ঘিরে কানাডার বর্তমান অবস্থান বুঝতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আগের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে কার্নি জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে নেতানিয়াহু কানাডায় প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই বক্তব্যের পর দেশটির সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি কানাডায় প্রবেশের বিষয় নয়। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরের সম্ভাব্য বিমানপথ এবং সেই পথে কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করা হবে কি না।
নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে নতুন আলোচনা
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরের সম্ভাব্য যাত্রাপথের সঙ্গে কানাডার আকাশসীমার প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় অটোয়ার কাছে বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে তিনি নেতানিয়াহুর বিমান কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করবে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। ফলে এখন পর্যন্ত বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়েই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক অনুমতির সমান্তরাল প্রশ্ন
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য যাত্রাপথকে ঘিরে আলোচনায় দুটি পৃথক মাত্রা রয়েছে। প্রথমটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং দ্বিতীয়টি কানাডার আকাশসীমা ব্যবহারের কূটনৈতিক অনুমোদন।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার নীতির কথা বলেছেন। একই সময়ে বিদেশি রাষ্ট্রীয় বিমানের জন্য নির্ধারিত কূটনৈতিক অনুমতির নিয়মও কার্যকর রয়েছে।
এ কারণে নেতানিয়াহুর কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার প্রসঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচলের তথ্য এবং কানাডার বিদ্যমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর।
সামনে কী বিষয় স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা
এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর বিমান বাস্তবে কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করবে কি না। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের উড্ডয়নের জন্য অটোয়ার কাছে কূটনৈতিক অনুমতির আবেদন করা হয়েছে কি না। তৃতীয়ত, কানাডার সরকার এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেয় কি না।
আনিতা আনন্দের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে যে তাঁর দপ্তর এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। অন্যদিকে, মার্ক কার্নির আগের বক্তব্যে কানাডার ভূখণ্ডে নেতানিয়াহুর প্রবেশের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।
ফলে কানাডার আকাশসীমা ব্যবহারের সম্ভাব্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক প্রটোকল এবং গাজা পরিস্থিতি নিয়ে কানাডার অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ জানিয়েছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যাওয়ার পথে কানাডার আকাশসীমা ব্যবহার করবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি তাঁর দপ্তরের কাছে তথ্য চেয়েছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। একই সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগে জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহু কানাডায় প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। এখন পর্যন্ত কানাডা শুধু সম্ভাব্য উড্ডয়ন সম্পর্কে তথ্য যাচাই করছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।





