এআই ছবির ঝড় তুললেন ট্রাম্প, দিচ্ছেন সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক বার্তা, ইরান অভিযান ও ২০২৮ সালের রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সামনে এসেছে নতুন পোস্টে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একাধিক ছবি প্রকাশ করেছেন। এসব ট্রাম্পের এআই ছবিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ২০২৮ সালের নির্বাচনী প্রচারের নানা রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
রবিবার প্রকাশিত এসব পোস্টে ট্রাম্পকে কখনো যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করতে, কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের নির্দেশ দিতে এবং কখনো ভবিষ্যৎ সামরিক প্রযুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রতীকী চরিত্রদের সঙ্গে দেখা গেছে। প্রথম দফার ছবিগুলোর বেশিরভাগই ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকেন্দ্রিক। পরে প্রকাশিত ছবিগুলোতে গুরুত্ব পায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং ‘ট্রাম্প ২০২৮’ প্রচারণা।
ট্রাম্পের এআই ছবিতে ইরানকেন্দ্রিক সামরিক বার্তা

প্রথম দফায় প্রকাশিত ট্রাম্পের এআই ছবিগুলোর মধ্যে ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের একটি ছবি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। সেখানে ট্রাম্পকে বিশাল আকৃতিতে দিগন্তের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার সামনে ‘ইউএসএ’ লেখা একটি মার্কিন গোপন যুদ্ধবিমান উড়ছে।
ছবির নিচের অংশে ‘ইরান’ লেখা একটি স্থল লক্ষ্যবস্তুতে বড় বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। একই ছবিতে সমুদ্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ টহল দেওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শক্ত অবস্থানের একটি প্রতীকী বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
আরেকটি ছবির শিরোনাম ছিল ‘স্ট্রাইক অন খার্গ’। এতে ইরানের খার্গ দ্বীপের প্রধান তেল টার্মিনালে বিমান হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ছবিতে যুদ্ধবিমান, বড় আগুন, ঘন কালো ধোঁয়া এবং জ্বলতে থাকা তেলের ট্যাংক দেখা যায়।
তেলবাহী জাহাজ ও সামরিক অভিযানের প্রতীকী দৃশ্য
‘ইটস আওয়ার অয়েল ট্যাঙ্কার নাউ!’ শিরোনামের আরেকটি ছবিতে ট্রাম্প ও অস্ত্রধারী মার্কিন সেনাদের একটি ইরানি জাহাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা কয়েকজন মানুষ সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছেন। পেছনে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীও দেখা যায়।
‘নো মোর ইঞ্জিনস’ শিরোনামের ছবিতে একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। জাহাজটির পেছনের অংশ উড়ে গেছে এবং সেখান থেকে আগুন ও কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি ছবিতে ট্রাম্পকে যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। একটি ছবিতে তার মাথায় ‘এফএএফও’ লেখা টুপিও ছিল।
চার্টে সামরিক সংঘাতের তুলনা
ট্রাম্পের প্রকাশিত পোস্টগুলোর মধ্যে একটি চার্টও ছিল। সেখানে আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সময়ের ভিয়েতনাম ও ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সঙ্গে তার সময়ের স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযানের তুলনা করা হয়েছে।
চার্টে দাবি করা হয়েছে, চার মাসের ‘ইরান সামরিক সংঘাতে’ ১৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, এক দিন স্থায়ী ‘ভেনেজুয়েলা যুদ্ধে’ কোনো প্রাণহানি ঘটেনি বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই চার্টের মাধ্যমে ট্রাম্পের সময়কার সামরিক অভিযানকে আগের প্রশাসনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এআই ছবি ও ২০২৮ সালের রাজনৈতিক প্রচার
দ্বিতীয় দফায় প্রকাশিত ট্রাম্পের এআই ছবিগুলোর বিষয়বস্তু মূলত সামরিক অভিযান থেকে সরে রাজনৈতিক প্রচার ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির দিকে যায়।
‘গিভ দ্য এনিমি নাইটমেয়ার্স’ শিরোনামের একটি ছবিতে ট্রাম্পকে অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন বনের মধ্যে হাঁটতে দেখা যায়। তার চারপাশে লাল জ্বলজ্বলে চোখওয়ালা সৈন্য রয়েছে। ছবিতে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘ট্রাম্প ২০২৮’।
আরেকটি পোস্টারের নাম ছিল ‘কসমিক কমান্ডার’। বিজ্ঞান কল্পকাহিনিভিত্তিক এই ছবিতে মহাকাশের পটভূমিতে ট্রাম্পের বড় মুখাবয়ব দেখানো হয়েছে। চারপাশে ভবিষ্যতের মহাকাশযান এবং সামরিক মহাকাশ বাহিনীর প্রতীকও রয়েছে।
এ ছাড়া আরেকটি ছবিতে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন এবং আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবিটির স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।
গাঢ় রঙের পটভূমিতে ‘প্ল্যান ট্রাস্টেড’ লেখা একটি ছবিও প্রকাশ করেন ট্রাম্প। পাশাপাশি ‘ট্রাম্প ২০২৮’ ব্যানারের অধীনে নিজের, মার্কিন সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষের আরও কয়েকটি এআই-নির্মিত ছবি পোস্ট করেন তিনি।
সামরিক অভিযান স্থগিতের প্রতিবেদনের মধ্যেই পোস্ট
ট্রাম্পের এই পোস্টগুলো এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, তিনি আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে পেন্টাগনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা, উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ ছাড়া বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক সংকট আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রচারের সমন্বিত বার্তা
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের এআই ছবিগুলোর প্রথম অংশে সামরিক শক্তি, ইরানকেন্দ্রিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে গুরুত্ব পেয়েছে ‘ট্রাম্প ২০২৮’, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি।
একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান নিয়ে পরিকল্পনা স্থগিত থাকার প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় পোস্টগুলো নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। তবে প্রকাশিত ছবিগুলো এআই-নির্মিত এবং এগুলোতে সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক প্রচারের বিভিন্ন প্রতীকী দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টগুলোতে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সামরিক শক্তি, যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রচারের বিভিন্ন বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম দফার ছবিতে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সামরিক দৃশ্য থাকলেও পরের পোস্টগুলোতে ‘ট্রাম্প ২০২৮’ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর মতো রাজনৈতিক বার্তা সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, বড় ধরনের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়ে পরিকল্পনা স্থগিত থাকার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এসব পোস্ট সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক ঝুঁকি এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচারের বিষয়গুলো একই আলোচনায় এসেছে।





