এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (14)
ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ : স্কুলগুলোর অবস্থা কতটা জরাজীর্ণ
News Photocard (11)
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে হামলা, তেলের দাম বেড়ে ১০২ ডলার
News Photocard (18)
ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন: ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করতে চাইছে : ট্রাম্প
News Photocard (6)
প্রথমবারের মতো সক্রিয় মক্কা চুক্তি, সৌদিতে সেনা পাঠাচ্ছে তুরস্ক-পাকিস্তান
News Photocard (23)
কানাডায় সেরা অভিনেত্রী তুষি, রইদ জিতেছে তিন পুরস্কার

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন, সাহসী ও নতুন ধরনের সাহিত্যকর্ম, ভাষা এবং প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্য নিয়ে পরীক্ষার স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন। সাহিত্যে তার সাহসী ও নতুন ধরনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে এ বছরের সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। সুইডিশ একাডেমির ঘোষণায় কার্সনের সাহিত্যকর্মে নতুন ধরনের সাহিত্যিক রূপ তৈরির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

অ্যান কার্সন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি অনুবাদক ও শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। তার সাহিত্যজুড়ে ভাষা, শব্দের উৎস, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য এবং প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামো ভেঙে নতুন ধরনের লেখার প্রবণতা স্পষ্ট।

ভাষা ও শব্দের প্রতি বিশেষ আগ্রহ

অ্যান কার্সনের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দ ও ভাষার ব্যবহার। নতুন অর্থ ও ভাবনা তৈরির জন্য তিনি শব্দের উৎস এবং ব্যুৎপত্তি নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। তার অনেক লেখার সূচনাও হয়েছে কোনো শব্দের ব্যুৎপত্তি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে।

১৯৮১ সালে ক্লাসিকস বিষয়ে তার ডক্টরাল থিসিস প্রকাশিত হয়। এর নাম ছিল ‘ওদি এত আমো এরগো সুম’। ল্যাটিন এই বাক্যাংশটির শাব্দিক অর্থ—‘আমি ঘৃণা করি এবং আমি ভালোবাসি, সুতরাং আমি আছি’।

তার সাহিত্যচর্চায় একদিকে যেমন কবিতার উপস্থিতি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে অনুবাদ, প্রবন্ধ, গবেষণা ও বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল লেখার সমন্বয়। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে এই বহুমাত্রিক কাজই তার স্বতন্ত্র পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

অ্যান কার্সনের সাহসী ও নতুন সাহিত্যিক রূপ

অ্যান কার্সন পুরো সাহিত্যজীবনে লেখার নতুন নতুন ধরন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভিন্নভাবে লেখার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল।

২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’ বইটি তার এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বইটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট রচনা রয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট কোনো ধারাবাহিকতা অনুসরণ না করেও পড়া যায়। ফলে বইটির কাঠামোও প্রচলিত বইয়ের বিন্যাস থেকে আলাদা।

সাহিত্যের প্রচলিত সীমারেখাকে প্রশ্ন করার এই প্রবণতা অ্যান কার্সনের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, গবেষণা এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে তার লেখার যোগাযোগ তার সৃজনশীল পদ্ধতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে।

বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে অ্যান কার্সনের কাজ

অ্যান কার্সনের কাজ শুধু বই বা কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৃশ্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক, অপেরা ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে যৌথভাবেও তিনি কাজ করেছেন।

এই সহযোগিতাগুলো তার সাহিত্যচিন্তার আরেকটি দিক তুলে ধরে। সাহিত্যকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে এর যোগাযোগ তৈরি করেছেন।

১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে তার কাজ বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রবণতা তার সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’ বইতেও এই বৈচিত্র্যময় লেখার ধরন দেখা যায়। বইটিতে বিভিন্ন ধরনের রচনা রয়েছে। এর মধ্যে অভিনয় ও মঞ্চ পরিবেশনার উপাদানও রয়েছে। একই সঙ্গে সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রের নানা বিষয় এতে উঠে এসেছে।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে আধুনিক সৃজনশীলতা

অ্যান কার্সনের সাহিত্যকর্মে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ করেছেন।

গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার বিভিন্ন খণ্ডাংশ নিয়ে তার কাজ উল্লেখযোগ্য। ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার’-এ স্যাফোর কবিতার বিভিন্ন অংশ নিয়ে তার কাজ দেখা যায়।

এ ছাড়া গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগোন’ এবং ইউরিপিডিসের ‘বাক্কাই’ নাটকও তিনি অনুবাদ করেছেন। এসব অনুবাদ যথাক্রমে ২০০১ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়।

কার্সনের ক্ষেত্রে প্রাচীন সাহিত্য কেবল অনুবাদের বিষয় নয়; বরং পুরোনো সাহিত্যিক উপাদানকে আধুনিক ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি মাধ্যম হিসেবেও তা ব্যবহৃত হয়েছে।

১৯৯০-এর দশকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম

১৯৯০-এর দশকে অ্যান কার্সন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ কাব্যগ্রন্থের ‘দ্য গ্লাস এসে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই দীর্ঘ কবিতায় কবিতা, প্রবন্ধসহ বিভিন্ন সাহিত্যধারার মিশেল রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কার্সন দীর্ঘ কবিতাকে একটি ভিন্ন রূপে উপস্থাপন করেন। এখানে বিভিন্ন সাহিত্যধারার সীমানা সবসময় স্পষ্ট থাকে না।

এই ধরনের পরীক্ষামূলক পদ্ধতি তার সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রচলিত কোনো একটি ঘরানার মধ্যে লেখাকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি একাধিক ধরনকে পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন।

‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’-এ প্রাচীন ও আধুনিকের মেলবন্ধন

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’ অ্যান কার্সনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বইটিতে তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক জীবন ও ভাষার সঙ্গে মিলিয়েছেন। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরিয়ন—ডানাওয়ালা এক লাল দানব।

এই চরিত্রের ভাবনা নেওয়া হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক কবি স্টেসিখোরোসের গেরিয়নকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার খণ্ডাংশ থেকে। কার্সন সেই প্রাচীন গল্পকে আধুনিক ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন সাহিত্যিক রূপ তৈরি করেছেন।

এখানেই তার সাহিত্যিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়—প্রাচীন সাহিত্যকে কেবল অতীতের উপাদান হিসেবে না দেখে তা নতুন ভাষা ও নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুনর্নির্মাণ করা।

নোবেল স্বীকৃতিতে যে বিষয়টি সামনে এসেছে

সাহিত্যে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার অ্যান কার্সনের দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বড় স্বীকৃতি দিয়েছে। সুইডিশ একাডেমি তার সাহসী ও নতুন ধরনের সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে নতুন রূপ তৈরির দিকটিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

তার কাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ক্লাসিকসের গবেষণা এবং বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে সহযোগিতা—সবকিছুই তার সাহিত্যচর্চার অংশ। শব্দের উৎস ও অর্থ নিয়ে অনুসন্ধানের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতাও তার কাজকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

সাহিত্যে অ্যান কার্সন-এর নোবেল পাওয়া তাই শুধু একজন কানাডীয় লেখকের স্বীকৃতি নয়; তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন ধরনের লেখার পদ্ধতিরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অ্যান কার্সনের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার

অ্যান কার্সনের সাহিত্যজীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার—তিনি নির্দিষ্ট একটি সাহিত্যিক ঘরানায় নিজেকে আটকে রাখেননি। বরং কবিতা, অনুবাদ, প্রবন্ধ, ক্লাসিকস এবং মঞ্চশিল্পের নানা উপাদানকে নিজের কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

তার লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শব্দের ব্যুৎপত্তি ও ভাষার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। আবার সেই পুরোনো উপাদানকে আধুনিক ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ভিন্নধর্মী সাহিত্যিক রূপ।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার সেই দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল যাত্রারই বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

সর্বাধিক পঠিত