সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশি নিহত এবং আহত হয়েছেন আরও ৬ জন। শুক্রবার রাতে আল-হিমনা এলাকায় মদিনা থেকে জেদ্দা ফেরার পথে দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে দেশটির আল-হিমনা এলাকায় মদিনা থেকে জেদ্দায় ফেরার পথে বাংলাদেশিদের বহনকারী একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে সাতজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন। শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হতাহতদের পরিচয় ও দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়। নিহত ও আহত ব্যক্তিরা কক্সবাজারের তিনটি পরিবারের সদস্য।
মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জিয়াউর রহমান, তার তিন সন্তান, আলম শাহের স্ত্রী ও মেয়ে এবং আফসানা বিবি। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে বাংলাদেশ কনসুলেট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশি নিহত: যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে সৌদি আরবের আল-হিমনা এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। মদিনা থেকে জেদ্দায় ফেরার পথে বাংলাদেশিদের বহনকারী গাড়িটি সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেট এবং খোলাইস ট্রাফিক অফিসের বরাতে মন্ত্রণালয় জানায়, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন পাকিস্তানের একজন নাগরিক। দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার।
সৌদি ট্রাফিক পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অতিরিক্ত গতির কারণে চালক গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারান। একপর্যায়ে গাড়িটি উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
তবে গাড়িচালক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চাকা ফেটে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করছে।
নিহত সাত বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাতজন কক্সবাজারের তিনটি পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন।
নিহতদের পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
জিয়াউর রহমান ও তাঁর তিন সন্তান
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জিয়াউর রহমান। তাঁর সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর মেয়ে বুশরা এবং দুই ছেলে ইয়াসির ও ইয়াযান।
দুর্ঘটনায় জিয়াউর রহমানের পরিবারের অন্য সদস্যরাও হতাহত হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী শাকিরা আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের আরেক মেয়েকে জেদ্দার বাদশা আব্দুল আজিজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহত জিয়াউর রহমান ও তাঁর তিন সন্তানের মরদেহ আল-হিমনা জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
আলম শাহের স্ত্রী ও মেয়ে নিহত
দুর্ঘটনায় নিহত অন্য দুজন হলেন আলম শাহের স্ত্রী সানজিদা এবং মেয়ে ফারিয়া।
তাদের মরদেহ সৌদি আরবের দুটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সানজিদার মরদেহ রয়েছে আল-হিমনা জেনারেল হাসপাতালে। অন্যদিকে ফারিয়ার মরদেহ রাখা হয়েছে খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে।
এই পরিবারের আরও সদস্য দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। আলম শাহের ছেলে ফায়সাল বর্তমানে ইস্ট জেদ্দা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
আলম শাহ নিজেও দুর্ঘটনায় আহত হন। তবে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি হাসপাতাল ছেড়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
নিহত আফসানা বিবি ও স্বামী ইলিয়াস
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আফসানা বিবি। তাঁর স্বামীর নাম ইলিয়াস।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গিয়েছিলেন আফসানা বিবি। দুর্ঘটনার পর তাঁর মরদেহ খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
আফসানার স্বামী ইলিয়াসও দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তবে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণের পর তিনি হাসপাতাল ছেড়েছেন।
আহত ছয় বাংলাদেশি কোথায় চিকিৎসাধীন?
দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, আবার কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে রয়েছেন:
শাকিরা: নিহত জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। তিনি খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জিয়াউর রহমানের আরেক মেয়ে: তাঁকে জেদ্দার বাদশা আব্দুল আজিজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ফায়সাল: আলম শাহের ছেলে। তিনি ইস্ট জেদ্দা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
আলম শাহ: প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
ইলিয়াস: নিহত আফসানা বিবির স্বামী। তিনিও প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
গফুর আলম: তিনি খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহতদের মধ্যে কারও চিকিৎসা চললেও কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। ফলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের সদস্যদের একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে আগের তথ্য ও মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্য
দুর্ঘটনার পর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছিল।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেটের কর্মকর্তারা প্রথমে সাতজন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিলেন। পরে আরও দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়।
তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে সাতজনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই বিজ্ঞপ্তিতেই নিহত ব্যক্তিদের নাম, পারিবারিক পরিচয় এবং আহতদের চিকিৎসার অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় সাতজন বাংলাদেশি নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই কক্সবাজারের তিনটি পরিবারের সদস্য।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে সৌদি ট্রাফিক পুলিশের প্রাথমিক ধারণা এবং গাড়িচালকের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতির কারণে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। অন্যদিকে চালকের দাবি, গাড়ির চাকা ফেটে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
গাড়িটির গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার ছিল বলে বাংলাদেশ কনসুলেট ও খোলাইস ট্রাফিক অফিসের বরাতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
তবে শুধু অতিরিক্ত গতি, নাকি যান্ত্রিক কোনো সমস্যাও দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
মরদেহ দেশে পাঠানো ও আহতদের চিকিৎসায় কনসুলেটের উদ্যোগ
দুর্ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ কনসুলেট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়েও কনসুলেট কাজ করছে।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে একই দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু এবং অন্য সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
এ ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।





