এইমাত্র

আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ: তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (19)
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
একাধিক বিদেশি দূতাবাসে হুমকির ইমেইল, তদন্তে সিটিটিসি
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
ব্যবস্থা নেবে ইসি: আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়নি এনসিপিসহ ৭ দল
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
অগ্রিম ৭৬ কোটি টাকা নিয়েও সিরাজগঞ্জ বিসিকে গ্যাসলাইন টানছে না পিজিসিএল

রোহিঙ্গা সংকটের দশম বছরে বাংলাদেশ, কমছে সহায়তা

রোহিঙ্গা সংকটের দশম বছরে বাংলাদেশ, প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই, কমছে বিদেশি সহায়তা। কক্সবাজারের শিবিরে খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে বাড়ছে চাপ, কঠিন হচ্ছে জীবন।

রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়ে সংকটটি দশম বছরে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। একই সময়ে কমে এসেছে বিদেশি সহায়তা। এতে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় অর্থের ঘাটতি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছে।

রোহিঙ্গা সংকট দশম বছরে, প্রত্যাবাসনে নেই অগ্রগতি

২০১৭ সালের বড় আকারের রোহিঙ্গা ঢলের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখছে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে রোহিঙ্গারা একসময় নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

তবে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি শরণার্থীদের বর্তমান জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কমে যাচ্ছে।

কমছে বিদেশি সহায়তা, কঠিন হচ্ছে শিবিরের জীবন

আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়ন কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করে চলা শরণার্থীশিবিরগুলোতে অর্থের ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা কমে গেলে খাদ্যসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

কক্সবাজারের শিবিরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সময় যত দীর্ঘ হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনও তত দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠছে। কিন্তু সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় সেই প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR-এর রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে।

আন্তর্জাতিক নজর কমার প্রভাব

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ১৯৯০-এর দশক থেকেই কাজ করছে কানাডাভিত্তিক দাতব্য সংস্থা হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা খান মনে করেন, বিশ্বে বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক সংকট চলার কারণে রোহিঙ্গা সংকট মানুষের নজরের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মাহমুদা খানের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে বিভিন্ন দেশ ও দাতার কাছ থেকে যেভাবে সহায়তা পাওয়া যেত, এখন আর সেই মাত্রায় সহায়তা আসছে না। এর প্রভাব পড়ছে শিবিরের জীবনযাত্রায়।

তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ মানুষের মনোযোগ কমে গেলে সহায়তাও আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা তাই শুধু সচেতনতার বিষয় নয়, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রোহিঙ্গাদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসা—এই তিনটি ক্ষেত্রকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শরণার্থীশিবিরে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা না থাকলে সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব পড়ে। একইভাবে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থীদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব শুধু শরণার্থীশিবিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা নিয়েও অর্থের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট। UNHCR-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।

রোহিঙ্গা শিবিরের বাস্তবতা উঠে এসেছে হোসাইনের কথায়

২০১৭ সালে কুতুপালং শিবিরে আসা ৩০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা হোসাইন জোহরের বক্তব্যে শিবিরের বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

তিনি জানিয়েছেন, অনেকের জন্য বর্তমান রেশন যথেষ্ট নয়। তাই রেশন বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

হোসাইনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শরণার্থীদের কাছে খাদ্য সহায়তা যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি জীবনের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নয় বছর ধরে শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু বর্তমান দিনের খাদ্য সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের চিকিৎসার প্রয়োজনও একই সঙ্গে পূরণ করতে হচ্ছে।

প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি সহায়তা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ একদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরানোর জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজারের শিবিরে থাকা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্বও বহন করছে।

এই দুই বাস্তবতার মধ্যে অর্থায়নের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্যে যেমন কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার বিষয়টি এসেছে, তেমনি তিনি অর্থায়ন কমে যাওয়ার সমস্যাটিও তুলে ধরেছেন।

এদিকে মানবিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। কারণ সহায়তা কমে গেলে শিবিরের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় চাপ আরও বাড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন

রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়ে সংকট দশম বছরে প্রবেশ করলেও প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। একই সময়ে কমছে বিদেশি সহায়তা। ফলে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে জীবনযাত্রার চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতিটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি বৈশ্বিক মনোযোগ ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থায়নের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন দশম বছরে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারে বসবাস করা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন এখনো বড় অমীমাংসিত বিষয়। এর পাশাপাশি বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় শিবিরগুলোর দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং সহায়তা বাড়াতে অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করাও জরুরি। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ধরে রাখাও এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সর্বাধিক পঠিত