আরও খবর

News Photocard (21)
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি ‘মিউজ’, যেসব সুবিধা পাবেন ব্যবহারকারীরা
News Photocard (9)
৯০ বছরের পুরনো গণিতের সমস্যা ৮৮ ঘণ্টায় সমাধানের দাবি ওপেনএআইয়ের
News Photocard (21)
যুক্তরাজ্যে ফিরলেও রাজকীয় দায়িত্ব পাচ্ছেন না হ্যারি-মেগান
News Photocard (3)
ভারত-বাংলাদেশ ট্রেন পরিষেবা ফের চালুর উদ্যোগ, ঢাকায় শুরু হচ্ছে বৈঠক
News Photocard
অ্যামাজনে বিধ্বস্ত বিমানটি যেভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল কার্গোতে

হরমুজ বন্ধ, তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১০৮ ডলার, বাংলাদেশে প্রভাব কতটা

হরমুজ বন্ধ, তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১০৮ ডলার, বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ৮২ সেন্টে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১০৩ ডলার ২২ সেন্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালির প্রভাব কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

বিশ্ববাজারে তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হুতিদের হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালির প্রভাব শুধু তেলের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য একই পরিমাণ তেল কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ড্রোন হামলার পর সৌদি কর্মকর্তারা পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এই পাইপলাইন কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কত দিন বন্ধ থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়েছে।

সৌদি আরবের তেল রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, পাইপলাইন চালু না থাকলে ইয়ানবু বন্দরে থাকা মজুত দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের রপ্তানি চাহিদা মেটানো সম্ভব।

ফলে হরমুজ প্রণালির প্রভাবের সঙ্গে সৌদি তেল সরবরাহের এই পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালির প্রভাব ও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি আমদানির ব্যয়। ঢাকা চেম্বারের এক হিসাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

একই হারে সারা বছর বাড়তি দামে তেল কিনতে হলে সরকারের বছরে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে আমদানি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকায় উঠেছে। এখানে ১ ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে হিসাব করা হয়েছে।

এরই মধ্যে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় সরকারের ঋণ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বেড়ে গেলে সরকারের আর্থিক চাপও বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি জ্বালানি আমদানির চাপ

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ানো হচ্ছে এবং এর চালান আসতেও শুরু করেছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই অতিরিক্ত আমদানি করা হচ্ছে।

সূত্র অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বরের পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে। ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনও আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির প্রভাব বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাড়তি জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সেই জ্বালানির দাম বাড়ছে।

অর্থাৎ একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয়ের চাপ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

পরিবহন, কৃষি ও শিল্পে কী প্রভাব পড়তে পারে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু তেল আমদানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন খাতের ব্যয়ও বাড়ে। একই সঙ্গে কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।

কৃষিতে যন্ত্রপাতি ও পরিবহন থেকে শুরু করে শিল্পের উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন—বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। জাহাজভাড়া বাড়লে বিদেশ থেকে পণ্য আনার খরচ বাড়ে। ফলে হরমুজ প্রণালির প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে।

মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ

বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচও যুক্ত থাকে। ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ কারণে হরমুজ প্রণালির প্রভাব বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও জড়িত।

বাব আল-মানদেবেও বাড়ছে উদ্বেগ

তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো বাব আল-মানদেব প্রণালির পরিস্থিতি। ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতিরা গত শুক্রবার পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপের মাধ্যমে তারা বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়েছে।

ইরানও জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত এবং চারজন নাবিক আহত হয়েছেন।

এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।

কূটনৈতিক আলোচনাও স্থগিত

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আলোচনার জন্য ওমানে সোমবার যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, সেটিও স্থগিত করা হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর জুনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। সেই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর যুদ্ধ বন্ধে আর কোনো শান্তি আলোচনা শুরু হয়নি।

ফলে হরমুজ প্রণালির প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

সামনে বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কত দিন উচ্চ থাকবে। দাম সাময়িকভাবে বাড়লে তার প্রভাব একরকম হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে আমদানি ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ইতিমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর নতুন করে দাম বাড়লে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।

তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাই হরমুজ প্রণালির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং এই অস্থিরতা কত দিন স্থায়ী হয়—এসব বিষয়ের ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং বাব আল-মানদেব—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও জ্বালানি করিডরের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক তেলবাজারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত