আর্জেন্টাইন ক্লাবের শতবর্ষী রেকর্ড চুরমার করল রোনালদোর দল, আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড এখন ৯৪ ম্যাচ। আল-খালিজের বিপক্ষে ড্র করেও রিভার প্লেটের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়েছে রোনালদোর দল।
সৌদি প্রো লিগে আল-খালিজের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেও ফুটবল ইতিহাসে বড় অর্জন করেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দল আল-নাসর। ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর হতাশা থাকলেও টানা ৯৪ ম্যাচে অন্তত একটি করে গোল করার কীর্তি গড়ে আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড এখন নতুন ইতিহাসের অংশ। রিয়াদভিত্তিক ক্লাবটি এর মাধ্যমে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে আর্জেন্টাইন জায়ান্ট রিভার প্লেটের গড়া টানা ৯৩ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড যেভাবে এলো

আল-খালিজের বিপক্ষে ম্যাচে আল-নাসরকে রেকর্ড গড়তে হলে অন্তত একটি গোল করতে হতো। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড আবদুল্লাহ আল-হামদান সেই গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করেন। তাঁর গোলেই সমতায় ফেরে আল-নাসর এবং একই সঙ্গে পূর্ণতা পায় টানা ৯৪ ম্যাচে গোল করার অসাধারণ ধারাটি।
এই গোলের মধ্য দিয়েই আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড নিশ্চিত হয়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে আলোচনায় থাকা রিভার প্লেটের ৯৩ ম্যাচের ধারাকে পেছনে ফেলে সৌদি ক্লাবটি এখন শীর্ষে।
বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব ফুটবলে টানা এত ম্যাচে গোল করার এই ধারাকে আল-নাসরের জন্য একটি অনন্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া ধারাটি কয়েক মৌসুম ধরে ধরে রাখার পর এবার সেটি বিশ্বরেকর্ডে রূপ নিয়েছে।
রিভার প্লেটের শতবর্ষী রেকর্ড ভাঙল আল-নাসর
আল-নাসরের আগে টানা ৯৩ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড ছিল আর্জেন্টিনার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেটের। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সালের সময়কালের সেই রেকর্ড ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ জায়গা দখল করে ছিল।
সেই পুরোনো রেকর্ড ভাঙতে আল-নাসরকে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে গোল করতে হয়েছে। সর্বশেষ ম্যাচে আল-খালিজের বিপক্ষে আবদুল্লাহ আল-হামদানের গোল সেই অপেক্ষার অবসান ঘটায়।
ফলে আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখা ধারাবাহিকতার ফল। একটি দল প্রতিটি ম্যাচে অন্তত একবার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠাতে পারার ধারাটি কতটা কঠিন, এই রেকর্ড তারই প্রতিফলন।
২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল রেকর্ডের যাত্রা
আল-নাসরের এই গোলের ধারার শুরু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল-হিলালের কাছে ৩-০ গোলে হারের পর পরের ম্যাচেই আল-রিয়াদের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয় পায় আল-নাসর।
সেই ম্যাচ থেকেই শুরু হয় টানা গোল করার ধারাটি। এরপর সৌদি প্রো লিগের একের পর এক ম্যাচে অন্তত একটি গোল করেছে রিয়াদের ক্লাবটি।
অর্থাৎ, আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতে থাকা দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। প্রতিটি ম্যাচে গোলের এই ধারাই শেষ পর্যন্ত তাদের রিভার প্লেটের ঐতিহাসিক রেকর্ড অতিক্রম করার সুযোগ এনে দেয়।
রোনালদোর প্রভাব ও আল-নাসরের ধারাবাহিকতা
২০২৩ সালে সৌদি ফুটবলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আল-নাসরের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। সোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ক্লাবটির হয়ে এখন পর্যন্ত ১১৩ ম্যাচে ১০৫ গোল করেছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা।
আল-নাসরের রেকর্ডযাত্রায় তাঁর অবদান তাই আলাদা করে আলোচনায় এসেছে। যদিও আল-খালিজের বিপক্ষে রেকর্ড গড়া ম্যাচে ঐতিহাসিক গোলটি করেছেন আবদুল্লাহ আল-হামদান, পুরো ধারাটির সময়কালে রোনালদো ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান তারকা।
রোনালদোর উপস্থিতি আল-নাসরের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও আরও বাড়িয়েছে। তাঁর সৌদি ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর দলটির ম্যাচ ও পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই সময়ের ধারাবাহিক গোলের যাত্রা এবার রেকর্ডে পরিণত হয়েছে।
রেকর্ডের আনন্দেও পয়েন্ট হারানোর হতাশা
তবে আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড উদযাপনের রাতটি পুরোপুরি আনন্দের ছিল না। কারণ আল-খালিজের বিপক্ষে জয়ের বদলে ১-১ গোলে ড্র করেছে রোনালদোর দল।
সৌদি প্রো লিগের রেলিগেশন অঞ্চলের ঠিক ওপরে থাকা আল-খালিজের বিপক্ষে পূর্ণ তিন পয়েন্ট না পাওয়ায় আল-নাসরকে হতাশ হতে হয়েছে। ঐতিহাসিক রেকর্ড নিশ্চিত হলেও ম্যাচের ফলাফল তাদের লিগ অবস্থানে প্রভাব ফেলেছে।
ড্রয়ের পর লিগ টেবিলের তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে আল-নাসর। শীর্ষে থাকা আল-হিলালের চেয়ে তারা দুই পয়েন্ট পিছিয়ে এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা আল ইত্তিহাদের চেয়ে এক পয়েন্ট পিছনে রয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে আল-নাসরের গোলের বিশ্বরেকর্ড অর্জনের ঐতিহাসিক সাফল্য, অন্যদিকে লিগে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হারানোর হতাশা—একই ম্যাচে দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে দলটি।
রোনালদোর সামনে আরও বড় ব্যক্তিগত মাইলফলক
আল-নাসরের দলীয় রেকর্ডের পাশাপাশি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারও এখন গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলকের সামনে।
৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলতি মৌসুমই হয়তো তাঁর পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হতে পারে। তবে অবসরের আগে তাঁর সামনে রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত অর্জনের সুযোগ।
সোর্স অনুযায়ী, রোনালদোর অফিশিয়াল গোলসংখ্যা এখন ৯৭৯। অর্থাৎ পেশাদার ক্যারিয়ারে ১ হাজার গোলের মাইলফলক থেকে তিনি মাত্র ২১ গোল দূরে।
ফলে আল-নাসরের বিশ্বরেকর্ডের পাশাপাশি রোনালদোর ১ হাজার গোলের লক্ষ্যও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
রেকর্ড ও ব্যক্তিগত মাইলফলক
আল-নাসরের ৯৪ ম্যাচের গোলধারা এবং রোনালদোর ৯৭৯ গোল—দুটি পরিসংখ্যানই দল ও খেলোয়াড়ের বর্তমান অবস্থাকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। একটি দল হিসেবে আল-নাসর যেমন ধারাবাহিকতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে, তেমনি রোনালদোও নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছেন।
তবে আল-নাসরের জন্য তাৎক্ষণিক বাস্তবতা হলো লিগের পয়েন্ট সংগ্রহ। রেকর্ড গড়ার পরও শীর্ষস্থান ধরে রাখতে হলে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তাদের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
ইতিহাসের পাতায় আল-নাসর
ফুটবলে দীর্ঘদিনের কোনো রেকর্ড ভাঙা সবসময়ই বিশেষ ঘটনা। আল-নাসরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা এমন একটি রেকর্ড ভেঙেছে, যা বহু দশক ধরে রিভার প্লেটের নামে ছিল।
আল-খালিজের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র তাই ফলাফলের দিক থেকে আল-নাসরের জন্য হতাশাজনক হলেও ইতিহাসের দিক থেকে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আবদুল্লাহ আল-হামদানের ৭২তম মিনিটের গোলটি দলের জন্য শুধু সমতাসূচক গোল ছিল না, এটি ছিল একটি দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ মুহূর্ত।
আল-খালিজের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেও টানা ৯৪ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়ে আল-নাসর বিশ্ব ফুটবলে নতুন নজির স্থাপন করেছে। ১৯৩৩–১৯৩৬ সালের রিভার প্লেটের ৯৩ ম্যাচের রেকর্ড পেছনে ফেলেছে তারা। একই সঙ্গে ৯৭৯ গোল নিয়ে ১ হাজার গোলের মাইলফলকের কাছাকাছি রয়েছেন ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।





