ব্রাজিল নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের চেষ্টা, অভিযোগে দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করেছে ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ অস্বীকার করে সফরকে রুটিন বলেছে।
ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ তৈরির অভিযোগে মার্কিন প্রশাসনের দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রাজিল সরকার। ব্রাজিলের দুই কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কর্মকর্তাদের সফরটি ছিল মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনার অংশ।
ব্রাজিল নির্বাচনে মার্কিন হস্তক্ষেপের অভিযোগ

ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া দুই মার্কিন কর্মকর্তা হলেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সচিব রাইলি এম. বার্নস এবং উপসহকারী সচিব স্যামুয়েল স্যামসন।
ব্রাজিলীয় কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন প্রতিনিধিদলের পরিকল্পনার পেছনে অক্টোবরের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা ছিল। তাদের অভিযোগ, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্রাজিলের নির্বাচনী পরিবেশকে জটিল করা এবং ভোটব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্রাজিলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরির পাশাপাশি নির্বাচনের পরিবেশ ঘোলাটে করার বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর গত শুক্রবার মার্কিন প্রতিনিধিদলের ভিসার আবেদন বাতিল করা হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা বক্তব্য
ব্রাজিলের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাইলি এম. বার্নস ও স্যামুয়েল স্যামসনের সফরটি ছিল নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনার অংশ।
মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সফরের আলোচ্য বিষয় ছিল মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা। নির্বাচনকে দুর্বল করা বা ব্রাজিলের ভোটব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই মুখপাত্র।
ফলে একই ঘটনাকে ঘিরে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ব্রাজিলীয় কর্মকর্তারা যেখানে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সফরটিকে নিয়মিত আলোচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
অক্টোবরের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মুখোমুখি হচ্ছেন কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো।
ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। ব্রাজিলীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হলে তা আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মার্কিন প্রশাসন এ ধরনের উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
২০২২ সালের নির্বাচন থেকে বিতর্কের সূত্রপাত
ব্রাজিলের ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের পেছনে ২০২২ সালের নির্বাচনের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনে লুলিজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হওয়ার পর জাইর বলসোনারো ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জাইর বলসোনারোকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বর্তমানে তিনি গৃহবন্দি রয়েছেন।
ফ্লাভিও বলসোনারোর বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক
জাইর বলসোনারোর পরিবর্তে এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া তার ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোও ব্রাজিলের ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন তুলছেন।
এ কারণে নির্বাচনের আগে ভোটব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আবারও জোরালো হয়েছে। ব্রাজিলীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি বা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করার যেকোনো উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের কর্মকর্তাদের পরিকল্পিত সফরের উদ্দেশ্য ছিল মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা। ফলে সফরটির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
দুই দেশের বক্তব্যে যে পার্থক্য
ব্রাজিলের পক্ষ থেকে মূল অভিযোগ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার সফর আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। বিশেষ করে ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ তৈরির বিষয়টি ব্রাজিলীয় কর্মকর্তারা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, সফরটি ছিল নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ। তাদের দাবি, নির্বাচনকে দুর্বল করার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
এই ভিন্ন অবস্থানের কারণে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্যে অটল রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে নজর থাকবে পরবর্তী পদক্ষেপে
ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে। এর মধ্যে দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে।
তবে ব্রাজিল সরকার যে অভিযোগ তুলেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে। তাই ঘটনাটির পরবর্তী কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং নির্বাচনের আগে দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিলের নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও বাড়তে পারে। তবে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, মূল বিরোধটি কেন্দ্রীভূত হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরির অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সফরের উদ্দেশ্যকে ঘিরে।
ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। ব্রাজিলীয় কর্মকর্তারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার এবং ভোটব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ তৈরির অভিযোগ তুললেও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করেছে।
২০২২ সালের নির্বাচন, জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এবং এবার তার ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষাপটে বর্তমান ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে দুই দেশের বক্তব্যের পার্থক্যই এখন এই বিতর্কের মূল বিষয়।





