কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন, নিখোঁজ পরিবারকে নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বুকিংয়ের নথিতে তুহিন, স্ত্রী ও দুই মেয়ের নাম থাকলেও মিলছে না খোঁজ। ১০ জনের মৃত্যু, পরিচয় শনাক্তে চলছে ডিএনএ পরীক্ষা।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নাহিদুর রহমান তুহিন, তাঁর স্ত্রী আফসানা ও দুই মেয়ে রোবাইনা এবং সুনাইনার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজার রিসোর্টে আগুনে নিখোঁজ পরিবার নিয়ে স্বজনদের উদ্বেগ বাড়ছে। রিসোর্টের বুকিংয়ের নথিতে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের ২০২ নম্বর কক্ষে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রকাশিত তালিকায় তাঁদের নাম নেই। হাসপাতাল ও পুলিশের কাছ থেকেও পরিবারটির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় আগুন লাগার পর থেকে তাঁদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এই ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজার রিসোর্টে আগুনে নিখোঁজ পরিবার: বুকিংয়ের নথিতে চারজনের তথ্য

রিসোর্টের বুকিংয়ের নথি অনুযায়ী, নাহিদুর রহমান তুহিন ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য সুপার ডিলাক্স ২০২ নম্বর কক্ষটি বুক করেছিলেন। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাঁদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
বুকিংয়ের বিলের একটি কপি গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে। ওই নথি থেকে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের সময় পরিবারটির রিসোর্টে অবস্থান করার কথা ছিল। তবে বুকিংয়ের তথ্য থাকলেও আগুন লাগার পর তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ চারজনের মধ্যে রয়েছেন নাহিদুর রহমান তুহিন, তাঁর স্ত্রী আফসানা এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোবাইনা ও সুনাইনা। রোবাইনার বয়স সাত বছর, আর সুনাইনার বয়স তিন বছর।
স্বজনদের আশঙ্কা, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাঁদের কী হয়েছে, তা দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের কেউ মারা গেছেন, আহত হয়েছেন কিংবা নিরাপদে আছেন—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন নাহিদুর
নাহিদুর রহমান তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানিয়েছেন, তাঁর ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা বলেছিলেন। এরপর শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি নাহিদুরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি তিনি। নাহিদুরের স্ত্রী ও দুই মেয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের খোঁজ করছেন।
পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ নিহত ও আহত ব্যক্তিদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতেও তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও পুলিশের কাছ থেকেও তাঁদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে উদ্ধার হওয়া মরদেহ, আহত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
ঢাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন নাহিদুর
নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ঢাকায় স্ত্রী আফসানা এবং দুই মেয়ে রোবাইনা ও সুনাইনাকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মাও ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে জানা গেছে।
নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর কর্মজীবন ও পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে এসব পরিচয় এখনো তাঁর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। স্বজনদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অগ্নিকাণ্ডের পর চারজন কোথায় আছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য কখন পাওয়া যাবে।
যোগাযোগ করতে পারেননি গ্র্যান্ড পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামানও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
বর্তমানে চীনে অবস্থানরত মির্জা রকিবুজ্জামান জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি নাহিদুরের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। নাহিদুরকে একজন ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে।
কর্মস্থলের পক্ষ থেকেও যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও নাহিদুরের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে স্বজনদের পাশাপাশি তাঁর সহকর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে তাঁর কর্মস্থল থেকে যোগাযোগ করতে না পারার বিষয়টি নিখোঁজ থাকার কারণ বা পরিণতি সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত তথ্য দেয় না। প্রকৃত অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শনাক্তকরণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, নাহিদুর নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, আগুনের ঘটনায় প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রিসোর্টের একটি শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। পরে মরদেহগুলো উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এ অবস্থায় পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে নাহিদুর বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে নিশ্চিত কিছু বলা হয়নি।
পরিচয় শনাক্তে কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ পরীক্ষা
অগ্নিকাণ্ডে মরদেহের চেহারা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়লে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে। এ ঘটনায়ও কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের জন্য এ প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নমুনা সংগ্রহের কথা জানানো হলেও পরীক্ষার ফলাফল বা নিখোঁজ পরিবারের সঙ্গে কোনো মরদেহের পরিচয় মিলে যাওয়ার তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তাই যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই পরিবারটির অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।
১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার রিসোর্টে আগুন
গত শনিবার, ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে।
এই অগ্নিকাণ্ডে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
ঘটনার পর উদ্ধারকাজ চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগুনে মরদেহগুলোর অবস্থা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকজনের পরিচয় শনাক্তে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ কী ছিল, কীভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এ ঘটনায় কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না—এসব বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার গ্রেপ্তার, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি আগুন লাগার কারণ ও দায় নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান।
তদন্তের মাধ্যমে আগুন লাগার কারণ এবং ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারকে গ্রেপ্তারের তথ্য থেকেই অগ্নিকাণ্ডের কারণ বা তাঁর দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না। এ বিষয়ে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিন ও তাঁর পরিবারের অবস্থান নির্ধারণের বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। বুকিংয়ের নথিতে তাঁদের অবস্থানের তথ্য থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের পর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
স্বজনদের অপেক্ষা, নিশ্চিত তথ্যের প্রয়োজন
নাহিদুর রহমান তুহিনের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাঁর, তাঁর স্ত্রী আফসানা এবং দুই মেয়ে রোবাইনা ও সুনাইনার সন্ধান করছেন। বৃদ্ধ বাবা-মা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
একদিকে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, অন্যদিকে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
তবে এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পরিবারটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা নেই। তাঁদের নাম নিহত ও আহতদের প্রকাশিত তালিকায় পাওয়া যায়নি এবং হাসপাতাল ও পুলিশের কাছ থেকেও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
এ কারণে তাঁদের বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করাই জরুরি।
কক্সবাজারের এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পাশাপাশি নাহিদুরের পরিবারের নিখোঁজ থাকার ঘটনা স্বজনদের জন্য গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন তাঁদের অপেক্ষা, পরিবারের চার সদস্যের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং ঘটনার তদন্তে প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হওয়া।





