জামায়াতের ৩৪ এমপি বিদেশ সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। ১৭ দিনের সফরে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও সৌদি আরব যাওয়ার পরিকল্পনা এবং দলটির ব্যাখ্যা জানুন। বিস্তারিত।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবিতে লং মার্চ কর্মসূচি চলার মধ্যেই দলের ৩৪ জন সংসদ সদস্যের বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ১৭ দিনের এই সফরে ৩৪ এমপির মধ্যে অন্তত ২৫ থেকে ২৬ জন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়েছেন বলে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জামায়াতের ৩৪ এমপির বিদেশ সফর আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল এবং এটি দলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
সফরকারী দলের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সফরের উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, উন্নয়ন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। জামায়াতের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, দলের আমিরের অনুমতি নিয়ে এমপিরা বিদেশে গেছেন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও সফর সম্পর্কে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সমালোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে সফরের সময়কাল। কারণ, একই সময়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংকট নিরসনের দাবিতে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করছে।
জামায়াতের ৩৪ এমপির বিদেশ সফর: ১৭ দিনের সূচি

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সফরকারী দলের সদস্যরা দুই দফায় ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে প্রথম তিন দিন অবস্থানের পর ১৭ সেপ্টেম্বর তারা সিঙ্গাপুরে যান। এরপর শনিবার সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইনে পৌঁছান।
ফিলিপাইন সফর শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পথে বাহরাইনে যাত্রাবিরতি থাকবে। সৌদি আরবে গিয়ে ওমরাহ পালনের পর ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা রয়েছে সফরকারীদের।
সফরকারী দলে শুধু ৩৪ জন এমপিই নন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সাবেক এমপি ও সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান এবং লেখক জিয়াউল হকও রয়েছেন।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে অবশ্য সফরটিকে অন্তত পাঁচটি দেশ অন্তর্ভুক্ত একটি ‘স্টাডি ট্যুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দলটির পক্ষ থেকে সফরটি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
সফরের প্রথম ধাপে মালয়েশিয়ায় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাসজলি মালিক। তিনি রাজনৈতিক দল কেদিলান রাকাইয়াতের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক ব্যুরোর প্রধান এবং ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজ (আইএআইএস) মালয়েশিয়ার সঙ্গেও যুক্ত।
১৭ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক পোস্টে মাসজলি মালিক জামায়াতের এমপিদের আতিথ্য দেওয়ার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিশ্বজুড়ে সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন সারদারের ‘পোস্ট-নরমাল টাইমস’ ধারণা নিয়েও আলোচনা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা, সততা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জনগণের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
জামায়াতের সূত্রের দাবি, মাসজলি মালিক নিজ উদ্যোগে এমপিদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ করেন। মালয়েশিয়ায় থাকার সময় সফরকারীরা কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়াসহ (আইআইইউএম) বিভিন্ন স্থানও পরিদর্শন করেন।
সিঙ্গাপুরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও সিম্পোজিয়াম
১৭ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে যান জামায়াতের এমপিরা। সেখানে তারা নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন।
উৎসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গ্লোবাল র্যাংকিং অব একাডেমিক সাবজেক্টসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের সেরা হিসেবে স্থান পেয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সফরকারী দল একটি সিম্পোজিয়ামেও অংশ নেয়। সেখানে সিঙ্গাপুর কীভাবে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে, তার প্রেক্ষাপটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সিঙ্গাপুর সফর শেষে শনিবার ফিলিপাইনে পৌঁছান এমপিরা। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি’ বলছে জামায়াত
সফরকারী দলের সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য এবং ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, দলের আমিরের অনুমতি নিয়েই এমপিরা বিদেশ সফরে গেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সফরের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর বক্তব্য, দলের অনেক সংসদ সদস্যের আগে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং কীভাবে দেশগুলো উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে—এসব বিষয়ে বাস্তব ধারণা নেওয়াই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানও জানান, এই সফরের পরিকল্পনা আরও আগে করা হয়েছিল। সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কারণে সফরটি পিছিয়ে যায়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াতের অনেক সদস্য প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং তাঁদের অনেকেরই দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে সফরটি আয়োজন করা হয়েছে। তিনি এটিকে একধরনের প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করেন।
সফরটি রাজনৈতিক কি না—জামায়াতের ব্যাখ্যা
সফরকারী সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা এটিকে রাজনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না। তবে মালয়েশিয়ায় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে।
সফরকারীদের বক্তব্য, পূর্বপরিচিতি এবং সাংগঠনিক যোগাযোগের সূত্র ধরে এসব সাক্ষাৎ হয়েছে।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দল, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর চ্যালেঞ্জ, সংসদীয় আচরণ, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা, স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহি এবং পরিকল্পনার মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থাৎ সফরের সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক হলেও জামায়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, এর মূল উদ্দেশ্য দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা নয়; বরং অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন।
লং মার্চের সময়ে সফর নিয়ে কেন আলোচনা
এই সফর নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এর সময়কাল। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য যখন আট দফা দাবিতে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করছে, তখন দলের ৩৪ জন এমপি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংকট নিরসনের দাবিতে বিরোধী দলের লং মার্চের মধ্যে এমপিদের বিদেশ সফর নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে জামায়াতের বক্তব্য, সফরটি পূর্বনির্ধারিত এবং দলের পরিকল্পনার অংশ।
সুতরাং এখানে দুটি বিষয় পাশাপাশি রয়েছে—একদিকে চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচি, অন্যদিকে আগে থেকে পরিকল্পিত একটি দীর্ঘ বিদেশ সফর। সফরের সময় নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, জামায়াত সেটিকে পূর্বপরিকল্পিত কর্মসূচির ব্যাখ্যা দিয়ে দেখছে।
‘পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা’ হিসেবে বিদেশ সফর
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, দলের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতাদের আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই রয়েছে। বর্তমান সফরকে সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভবিষ্যতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দলের সদস্যদের সফরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এসব সফরে শুধু সংসদ সদস্য নয়, তরুণ নেতৃত্ব এবং ছাত্রসংগঠনের নেতারাও অংশ নিতে পারেন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এসব সফরের সম্ভাব্য কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া সেলের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও বলেছেন, দলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এর আগেও অনেক সদস্য বিদেশে গেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সফর সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, তবে এবার বিশেষভাবে সংসদ সদস্যদের জন্য এটি পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমান সফরের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইন থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে বাহরাইনে যাত্রাবিরতির সময় বিমানবন্দরের আশপাশের কিছু স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের পর ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা সফরকারীদের।
অন্যদিকে, সফরের পাশাপাশি দেশে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কর্মসূচিও চলমান। ফলে জামায়াতের ৩৪ এমপির বিদেশ সফর নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সফরের সময়, পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ, বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্য।
জামায়াতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি পূর্বপরিকল্পিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কর্মসূচি। অন্যদিকে, চলমান লং মার্চের সময় বিপুলসংখ্যক এমপির দেশের বাইরে অবস্থান করায় সফরটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে এ দুই অবস্থানই আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।





