আরও খবর

News Photocard (21)
চ্যাটজিপিটিকে পেছনে ফেলল মেটার ‘মিউজ’
News Photocard (24)
ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তেজনা, ঐতিহাসিক বৈঠকে ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ঘোষণা
News Photocard (12)
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার ফি নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
News Photocard (6)
‘এআই ফোর্স’ গঠনের ঘোষণা ট্রাম্পের
News Photocard (18)
এআইয়ের ভুল তথ্যে চীনের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধে জড়াচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র: সিএনএন

কলকাতায় হোটেল-গেস্টহাউসে কড়াকড়ি, বিপাকে বাংলাদেশি রোগীরা

কলকাতায় হোটেল-গেস্টহাউসে কড়াকড়ি, বাংলাদেশি রোগী ও স্বজনদের আবাসন সংকট তীব্র হয়েছে। ৯১৯ হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধের পর বাড়ছে ভাড়া, বিপাকে পড়ছেন স্বল্পবিত্ত রোগীরা।

কলকাতায় বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য হোটেল-গেস্টহাউসে থাকার সংকট তীব্র হয়েছে। ১৯ আগস্ট মধ্য কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত সাতজন বাংলাদেশিসহ নয়জন নিহত হওয়ার পর কলকাতা পৌরসভা শহরের হোটেল ও গেস্টহাউসে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শনের পর ৯১৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বড় অংশ আবাসন সংকটে পড়েছেন।

বিশেষ করে হাসপাতালসংলগ্ন এলাকার কম বাজেটের গেস্টহাউসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়ছেন স্বল্পবিত্ত রোগীরা। চালু থাকা কিছু অতিথিশালায় ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশি পরিবারকে অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।

কলকাতায় বাংলাদেশি রোগী, ফুটপাতেও রাত কাটানোর অভিযোগ

নেত্রকোনার মহম্মদ রফিকুলের পরিবারের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতির কঠিন দিকটি সামনে এনেছে। বড় ভাই সফিকুলের ক্যানসার ধরা পড়ার পর স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে কেমোথেরাপির জন্য কলকাতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মেডিক্যাল ভিসা ও অর্থের ব্যবস্থা করে আগস্টের শেষে স্ত্রী সালমা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছান রফিকুল।

মধ্য কলকাতার একটি গেস্টহাউসে তাঁরা উঠেছিলেন। হাসপাতালে এক রাত কাটিয়ে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর সফিকুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আরও কিছু পরীক্ষা করানোর জন্য তাঁদের কয়েক দিন গেস্টহাউসে থাকার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু অগ্রিম টাকা পরিশোধ করা সত্ত্বেও প্রথম রাতেই তাঁদের গেস্টহাউস ছাড়তে বলা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মালপত্রসহ তাঁদের বের করে দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হয়। পরে আশপাশে অন্য গেস্টহাউস বা হোটেল খুঁজেও তাঁরা জায়গা পাননি। শেষ পর্যন্ত রোগীসহ পরিবারের সদস্যদের ফুটপাতে প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে রাত কাটাতে হয়।

রফিকুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসার জন্য এসে তাঁদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তাঁরা ভাবেননি।

হাসপাতালসংলগ্ন এলাকাতেও একই চিত্র

শুধু মধ্য কলকাতায় নয়, শহরের পূর্ব প্রান্তে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসসংলগ্ন হাসপাতাল এলাকাতেও গত তিন সপ্তাহে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। ডি’সান, মণিপাল, পিয়ারলেস, নারায়ণা আর এন টেগোরসহ বিভিন্ন করপোরেট হাসপাতালের আশপাশে বেশ কিছু গেস্টহাউস ও হোটেল বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক নির্দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পৌরসভার অভিযানে প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তার মাপকাঠিতে মাত্র ৪১টি হোটেল উত্তীর্ণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চালু থাকা অতিথিনিবাসগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে কম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর।

৯১৯ হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধের পেছনে অগ্নিনিরাপত্তা

১৯ আগস্টের অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ওই ঘটনায় অন্তত সাতজন বাংলাদেশি নাগরিকসহ নয়জন মারা যান। তদন্তে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত ছাড়পত্রসহ একাধিক বৈধ অনুমোদন না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।

এরপর কলকাতা পৌরসভা অবৈধ হোটেল ও গেস্টহাউস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শনের পর ৯১৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দেশিকা জারি করে সেগুলো সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, মারকুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও কলিন লেনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। অভিযানে মিশ্র ব্যবহারযোগ্য ভবনে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া হোটেল পরিচালনার ঘটনাও পাওয়া গেছে।

কলকাতার পৌর কমিশনার স্মিতা পান্ডে বলেছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

কম বাজেটের আবাসন বন্ধে সবচেয়ে বেশি চাপে বাংলাদেশিরা

কলকাতার আলিপুর এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য যাওয়া অনেক রোগী সাধারণত কম বাজেটের আবাসনের ওপর নির্ভর করতেন। মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ই এম বাইপাস, গড়িয়া, সন্তোষপুর, মুকুন্দপুর, পাটুলি ও কালিন্দীর মতো এলাকায় বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ছোট হোটেল ও গেস্টহাউস গড়ে উঠেছিল।

সাম্প্রতিক পৌর নজরদারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এখন বন্ধ। অনেক পুরোনো ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র পেতে মূল নকশা প্রয়োজন হচ্ছে। ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরোনো ভবনের সেই নকশা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ইচ্ছা থাকলেও আইনি ও নথিপত্রসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

মুকুন্দপুরে একাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান

ই এম বাইপাসসংলগ্ন মুকুন্দপুর এলাকায় বাংলাদেশি রোগীদের জন্য অনেক অতিথিশালা রয়েছে। নারায়ণা আর এন টেগোর হাসপাতালের কাছে সরকারপাড়ার একটি গেস্টহাউসের ব্যবস্থাপক রঞ্জন পাইকের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়ামনগর ও সরকারপাড়ার অন্তত ৩০টি গেস্টহাউস ও হোটেলে পৌরসভার পরিদর্শকেরা অভিযান চালিয়েছেন।

কিছু মালিক বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, পুলিশি নিরাপত্তা সনদ ও ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। তাঁদের বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহ না করা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রঞ্জন পাইক আরও অভিযোগ করেছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বৈধভাবে সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লাগার আশঙ্কায় কিছু মালিক পৌর কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে অবৈধ আর্থিক সমঝোতার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে অঘোষিতভাবে এক লাখ রুপির ‘প্যাকেজ’-এর কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এটি তাঁর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; এর স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

কলকাতায় বাংলাদেশি রোগী কমে যাওয়ার আশঙ্কা

গত দেড় দশকে ই এম বাইপাসের আশপাশে রুবি, ডি’সান, ফর্টিস, মণিপাল, নারায়ণা আর এন টেগোর ও পিয়ারলেসের মতো আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরুতে এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি।

তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে কলকাতায় বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

পরবর্তীতে দুই দেশের কূটনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধের পদক্ষেপ সেই প্রবাহে নতুন বাধা তৈরি করেছে।

আবাসনের সংকটের কারণে বাংলাদেশের কিছু রোগী দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

হাসপাতালগুলোর উদ্যোগ

পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতার করপোরেট হাসপাতালগুলোও উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশি রোগীদের থাকার সুবিধার জন্য কয়েকটি অনুমোদিত গেস্টহাউসের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চুক্তি করেছে।

চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসতে আগ্রহী রোগীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতেও হাসপাতাল কর্মকর্তারা বাংলাদেশে নিজস্ব টিম পাঠাচ্ছেন।

উডল্যান্ডস হাসপাতালের সিইও রূপক বড়ুয়া জানিয়েছেন, নিরাপদ হোটেলে থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রোগীদের জানানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের আলিপুর এলাকার কিছু গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা দেওয়া হবে, যাতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী কলকাতায় যাওয়ার আগেই তাঁরা থাকার জায়গা বুক করতে পারেন। ইতিমধ্যে কেউ কেউ বুকিং করেছেন এবং অন্যরা হাসপাতালের সহায়তা চেয়েছেন বলেও তিনি জানান।

আবাসন সংকটে স্থানীয় ব্যবসাতেও প্রভাব

হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধের প্রভাব শুধু রোগী ও স্বজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ভাতের হোটেল, ওষুধের দোকান, ফরেন এক্সচেঞ্জ কাউন্টার ও ট্র্যাভেল এজেন্টদের ব্যবসাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

কলকাতায় বাংলাদেশি রোগীর যাতায়াত কমে যাওয়ার প্রভাব আগেও হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট ছোট ব্যবসাগুলোতে পড়েছিল। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে রোগীর সংখ্যা কমার পর সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু হোটেল-গেস্টহাউসে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক কড়াকড়ি সেই প্রত্যাশাকে আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। কলিন স্ট্রিটের এক ট্যুর অপারেটর প্রশাসনের পদক্ষেপে ব্যবসায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নিরাপত্তা ও চিকিৎসা-পর্যটনের মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্ন

কলকাতার সাম্প্রতিক অভিযান মূলত হোটেল ও গেস্টহাউসের অগ্নিনিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। অন্যদিকে, আবাসন সংকটের কারণে চিকিৎসার জন্য শহরে আসা বিদেশি রোগীদের একটি অংশ সরাসরি সমস্যায় পড়ছেন।

বিশেষ করে কম বাজেটের আবাসন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বল্পবিত্ত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ওপর চাপ বেশি পড়ছে। চালু থাকা আবাসনে ভাড়া বেড়ে গেলে চিকিৎসার পাশাপাশি থাকার খরচও তাঁদের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোর অনুমোদিত গেস্টহাউসের সঙ্গে সমন্বয় এবং আগাম বুকিংয়ের উদ্যোগ বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত