কেন এতো পর্যটক ছিল নেপালের ওই এলাকায়, বন্যাকবলিত সীমান্ত এলাকার ধর্মীয় গুরুত্ব, মানস সরোবর ও গোসাইকুণ্ড ঘিরে পর্যটকদের উপস্থিতির কারণ জানুন বিস্তারিত তথ্য এই প্রতিবেদনে।
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিকের বেশিরভাগই ভারতীয়। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নেপালে এত পর্যটক কেন ওই বন্যাকবলিত এলাকায় ছিলেন?
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও কাদাধসের ঘটনায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জন হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি এ তথ্য জানিয়েছে। তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা তিনজন বলে জানানো হয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এই অঞ্চলটি শুধু ভৌগোলিক কারণে নয়, ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই এলাকার দুটি উচ্চভূমির হ্রদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালে এত পর্যটক থাকার প্রধান কারণ ধর্মীয় পর্যটন

বন্যাকবলিত এলাকাটির সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল দুটি পবিত্র উচ্চভূমির হ্রদের জন্য পরিচিত।
এর একটি তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে অবস্থিত মানস সরোবর। অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ।
এই দুই স্থানকে ঘিরে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় পর্যটকের যাতায়াত হয়। বিশেষ করে নেপাল হয়ে অনেক পর্যটক মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
মানস সরোবর যাত্রায় নেপালের গুরুত্ব
তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। উৎসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে সেখানে যান।
ফলে নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রুটগুলোতে পর্যটকদের উপস্থিতি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বেড়ে যায়। এই যাত্রার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তীর্থভ্রমণ সরাসরি যুক্ত।
এ কারণে নেপালে এত পর্যটক দেখা যাওয়ার পেছনে সাধারণ অবকাশযাপন বা বিনোদনমূলক ভ্রমণের পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নানেও আসেন পর্যটকেরা
নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদও পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। উৎসের তথ্য অনুযায়ী, বছরের এই সময়টিতে বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা মানস সরোবর ভ্রমণের পাশাপাশি গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান করতে আসেন।
অর্থাৎ একই সময়ে দুটি ধর্মীয় গন্তব্যকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ে। নেপাল হয়ে মানস সরোবর যাত্রা এবং গোসাইকুণ্ডে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভ্রমণ—দুই কারণেই এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
এ কারণে বন্যা ও ভূমিধসে বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর নেপালে এত পর্যটক কেন ছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ধর্মীয় পর্যটনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
পূর্ণিমার সময় কেন পর্যটক বাড়ে?
পর্যটকদের উপস্থিতির আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছেন আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই রুটটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পূর্ণিমার সময়কে শুভ হিসেবে বিবেচনা করেন পর্যটকেরা। তাই সাধারণত এই সময়েই অনেকে এই এলাকায় আসেন।
এর ফলে বছরের নির্দিষ্ট সময় এবং বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকদের একটি বড় অংশ এই সময়ে মানস সরোবর ভ্রমণ ও গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নানের জন্য আসেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রিয় ট্রেক রুট
প্রদীপ পাণ্ডিতের ভাষ্য অনুযায়ী, আলপাইন কৈলাস ট্রেক একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রুট। ফলে ধর্মীয় গন্তব্যের পাশাপাশি এই পথটি পর্যটকদের চলাচলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে পর্যটকদের যাতায়াতের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, তীর্থভ্রমণ এবং জনপ্রিয় ট্রেক রুট—সবগুলো বিষয়ই যুক্ত হয়েছে।
বন্যা-ভূমিধসে কেন এত বিদেশি নিখোঁজ?
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিকের বেশিরভাগই ভারতীয়। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, দুর্যোগের সময় ওই এলাকায় বিদেশি পর্যটকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।
তবে উৎসের প্রতিবেদনে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সবার পরিচয় বা তারা ঠিক কোন স্থানে অবস্থান করছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই এ বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো তথ্য অনুমান করা ঠিক হবে না।
তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও বড় ক্ষয়ক্ষতি
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও কাদাধসের ঘটনা ঘটেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির বৃহস্পতিবার সকালের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জন হয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
ফলে দুর্যোগটি নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পর্যটন এলাকার ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ধর্মীয় গুরুত্বই পর্যটকদের টানে
সব তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, নেপালে এত পর্যটক থাকার পেছনে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও পর্যটন গুরুত্ব প্রধান বিষয়। মানস সরোবর ও গোসাইকুণ্ড—দুটি পবিত্র হ্রদকে ঘিরে প্রতিবছর পর্যটকদের যাতায়াত হয়।
বিশেষ করে বছরের এই সময় ভারতীয় পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ে। মানস সরোবর ভ্রমণ, গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান এবং পূর্ণিমার সময়কে শুভ মনে করার কারণে পর্যটকেরা এই সময়ে জনপ্রিয় রুটগুলো বেছে নেন।
এ কারণে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় এত বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর ওই এলাকায় পর্যটকদের উপস্থিতির কারণ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পর্যটকদের উপস্থিতির পেছনে মূলত ধর্মীয় পর্যটন ও জনপ্রিয় তীর্থ রুটের ভূমিকা রয়েছে। তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর এবং নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে মানস সরোবর যান। একই সময়ে বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান করতেও আসেন। আবার পূর্ণিমার সময়কে শুভ বিবেচনা করায় এই সময়টিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে বলে জানিয়েছেন আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত।





