সাংবাদিকের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর লিটন, ‘আচ্ছা পদত্যাগ করলাম, এশিয়ান গেমসে ২ ম্যাচে ২ ও ০ রান, শ্রীলঙ্কার কাছে হার এবং পদক হাতছাড়া নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশের অধিনায়ক লিটন দাস এশিয়ান গেমসে শ্রীলঙ্কার কাছে ৬৩ রানের হারের পর লিটনের পদত্যাগ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সংবাদ সম্মেলনে। দুই ইনিংসে ২ ও ০ রান করার পর অধিনায়ক হিসেবে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও লিটন জানিয়েছেন, ক্রিকেটে উত্থান-পতন থাকে এবং পদত্যাগ করার মতো কিছু হয়নি। তবে একই বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আচ্ছা এশিয়ান গেমস থেকে পদত্যাগ করলাম।’
বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান গেমসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব ছিল লিটন দাসের ওপর। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার হিসেবে দলের ব্যাটিংয়েও তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু প্রতিযোগিতার দুই ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছে যথাক্রমে ২ ও ০ রান।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স। শ্রীলঙ্কার কাছে ৬৩ রানের পরাজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তাই স্বাভাবিকভাবেই লিটনের নেতৃত্ব ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
লিটনের পদত্যাগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে লিটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এমন পারফরম্যান্সের পর তিনি অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না।
প্রথমবার প্রশ্নের জবাবে লিটন বলেন, তিনি পদত্যাগ করতে চান না। তার মতে, ক্রিকেটে ভালো ও খারাপ সময় থাকবেই। একদিন পারফরম্যান্স ভালো হতে পারে, আবার অন্যদিন খারাপ হতে পারে।
লিটনের বক্তব্যের সারকথা ছিল, এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করার মতো কিছু ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘রিজাইন করতে চাই না। ক্রিকেটে উত্থান-পতন থাকে। একদিন ভালো হবে, একদিন খারাপ হবে। এখানে রিজাইনের তো কিছু নেই।’
তবে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। একই প্রসঙ্গে আবার প্রশ্ন করা হলে লিটনের প্রতিক্রিয়া বদলে যায়।
দ্বিতীয় প্রশ্নে ক্ষুব্ধ লিটন
পদত্যাগের বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে লিটন অনেকটা ক্ষুব্ধ সুরে বলেন, ‘পদত্যাগ করে দিব? আচ্ছা এশিয়ান গেমস থেকে পদত্যাগ করলাম। দয়া করে পরের প্রশ্ন।’
তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগ প্রসঙ্গটি দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। অর্থাৎ, দলের ব্যর্থতার দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তিনি অধিনায়কত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানাননি।
দুই ইনিংসে ২ ও ০ রান
এশিয়ান গেমসে লিটনের ব্যক্তিগত ব্যাটিং পারফরম্যান্সও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিযোগিতার দুই ইনিংসে তিনি করেছেন ২ ও ০ রান।
দলের নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল তার। ফলে ব্যক্তিগতভাবে রান না পাওয়ার বিষয়টি দলের সামগ্রিক ব্যর্থতার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে লিটনের বক্তব্যে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে দলীয় পারফরম্যান্সের দিকটিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ কেন হেরেছে, সেই ব্যাখ্যায় তিনি প্রতিপক্ষের ব্যাটারের অসাধারণ ব্যাটিং এবং বাংলাদেশের নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন।
শ্রীলঙ্কার কাছে ৬৩ রানের হার
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের ৬৩ রানের পরাজয় নিয়ে লিটন সরাসরি স্বীকার করেছেন, দল ভালো ক্রিকেট খেলতে পারেনি।
তার ব্যাখ্যায়, ম্যাচের প্রথম আট ওভার বাংলাদেশ ভালো বোলিং করেছিল। কিন্তু এরপর শ্রীলঙ্কার একজন ব্যাটার কঠিন উইকেটে এমনভাবে ব্যাটিং করেন, যা বাংলাদেশের বোলারদের জন্য পরিস্থিতি বদলে দেয়।
লিটনের মতে, ওই ব্যাটারের অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কারণে বাংলাদেশের বোলাররা কীভাবে ম্যাচে ফিরে আসবেন, তার কোনো উপায় খুঁজে পাননি। তাই ওই ব্যাটারের ইনিংসকে কৃতিত্ব দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের পালা এলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি দল। লিটনের ভাষায়, ব্যাটিংয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ সেদিন ‘আপ টু দ্য মার্ক’ ছিল না।
প্রথম আট ওভারে ভালো শুরু, পরে নিয়ন্ত্রণ হারায় বাংলাদেশ
লিটনের বিশ্লেষণে ম্যাচটির দুটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। শুরুতে বাংলাদেশের বোলিং কার্যকর ছিল। প্রথম আট ওভারে দল ভালো অবস্থানে ছিল বলে মনে করেন অধিনায়ক।
কিন্তু এরপর শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের একটি বড় জুটি বা ব্যক্তিগত অসাধারণ ইনিংস ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। সেই চাপ সামলাতে পারেনি বাংলাদেশের বোলিং ইউনিট।
ব্যাটিংয়ে নেমেও বাংলাদেশ ঘাটতি পূরণ করতে পারেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত ৬৩ রানের বড় ব্যবধানে পরাজয় মেনে নিতে হয়।
পদক হারানোর হতাশা
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের আরেকটি বড় লক্ষ্য ছিল পদক জয়। সর্বশেষ তিন আসরে বাংলাদেশ কোনো না কোনো পদক জিতেছিল। এবারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু শ্রীলঙ্কার কাছে হারের ফলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
এ নিয়ে লিটন বলেন, ব্রোঞ্জ পদক জিততে না পারায় তার খারাপ লাগছে। দল এশিয়ান গেমসে ফাইনালে খেলার লক্ষ্য নিয়ে এসেছিল। সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার পর ব্রোঞ্জ জয়ের সুযোগটিকে বিকল্প হিসেবে দেখেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সুযোগও তারা কাজে লাগাতে পারেনি।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, দলের জন্য হতাশার জায়গাটি শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এশিয়ান গেমস থেকে পদক নিয়ে ফেরার সুযোগ হারানো।
সতীর্থদের পাশে লিটন
এদিকে ম্যানেজমেন্টকে না জানিয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করার কারণে বাংলাদেশের তিন ক্রিকেটার প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। তাদের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে সতীর্থদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন লিটন।
তার যুক্তি, একজন খেলোয়াড় সারাদিন হোটেলের কক্ষে বন্দি হয়ে বসে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে দলের দেওয়া খাবারে কোনো খেলোয়াড়ের প্রয়োজন মিটছে না মনে হলে খাবারের জন্য বাইরে যেতে হতে পারে।
লিটন বলেন, যদি সেখানে অনুশীলনের সুযোগ থাকত, তাহলে খেলোয়াড়দের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, খাবারসহ প্রয়োজনীয় কারণে খেলোয়াড়দের কক্ষের বাইরে যেতে হয়েছে।
এখানে লিটনের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন প্রয়োজন ও দলের ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরা।
নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও দলের ফল
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের পর লিটন দাসকে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় সামলাতে হচ্ছে। একদিকে অধিনায়ক হিসেবে দলের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিজের ব্যাটিংয়ে রান না পাওয়া এবং সবশেষে পদক হারানোর হতাশা।
দুই ইনিংসে ২ ও ০ রান করার পর অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাই সংবাদ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে লিটনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি পদত্যাগের কথা ভাবছেন না।
বরং তিনি ক্রিকেটের উত্থান-পতনের বিষয়টি সামনে এনেছেন এবং দলের ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় নিজেদের পারফরম্যান্সের ঘাটতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের অসাধারণ ব্যাটিংকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক জয়ের সুযোগ শেষ হওয়ার পর এখন আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকছে দলের পারফরম্যান্স, নেতৃত্ব এবং খেলোয়াড়দের ব্যবস্থাপনা। তবে সংবাদ সম্মেলনে লিটন যে অবস্থান জানিয়েছেন, তাতে লিটনের পদত্যাগ নয়, বরং দলের পারফরম্যান্সের ঘাটতি নিয়েই তার বক্তব্য ছিল বেশি স্পষ্ট।





