এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় কারা অংশ নিতে পারবেন, কাদের সুযোগ থাকছে না এবং কবে শুরু হতে পারে পরীক্ষা? জেনে নিন ৩ শর্ত, ফরম পূরণ ও ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময়।
এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি কমাতে বিশেষ সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে এই পরীক্ষা শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই ফল প্রকাশের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে তিনি পরীক্ষার সময়সূচি ও অংশগ্রহণের শর্ত সম্পর্কে তথ্য জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ পরীক্ষায় সবাই অংশ নিতে পারবেন না। সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলেও দুটির বেশি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারবেন না। তবে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অকৃতকার্য হওয়া কিছু শিক্ষার্থীর জন্যও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
সরকারের এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের যেন পুরো একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না হয়, সেই ব্যবস্থা করা।
এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা: কারা অংশ নিতে পারবেন?

আন্তশিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো তথ্য অনুযায়ী, এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অকৃতকার্য বিষয়ের সংখ্যা এবং পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আগের দুই বছরের কিছু অকৃতকার্য শিক্ষার্থীও এ সুযোগ পাবেন। তবে আগের বছরের পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে।
১. সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হতে হবে
এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রধান শর্ত হলো, একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হতে পারবেন। অর্থাৎ, এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা সম্পূরক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থী দুটির বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন, তাঁরা এ বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
এ কারণে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের নিজেদের ফলাফল এবং অকৃতকার্য বিষয়ের সংখ্যা যাচাই করা প্রয়োজন।
২. ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরাও পাবেন সুযোগ
এ পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সুযোগটি শুধু ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে সম্পূরক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
ফলে আগের দুই বছরে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন করে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে আগের বছরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শুধু ওই বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়াই যথেষ্ট হবে না। তাঁদের ২০২৬ সালে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অথবা বৈধ রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে।
৩. ২০২৬ সালের পরীক্ষা বা বৈধ রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে
২০২৪ ও ২০২৫ সালে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে ২০২৬ সালের পরীক্ষাসংক্রান্ত বৈধতা।
অর্থাৎ, আগের বছরগুলোতে ফেল করা কোনো শিক্ষার্থীকে এ বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে অথবা তাঁর বৈধ রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে।
এই শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরপর দুই বা তিন বছর ধরে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরাও সম্পূরক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে তাঁদের ক্ষেত্রেও অকৃতকার্য বিষয়ের সংখ্যা-সংক্রান্ত নিয়ম প্রযোজ্য হবে। দুটির বেশি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য এ সুযোগ থাকছে না।
কবে শুরু হবে এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা?
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা জানিয়ে বুধবার (৪ নভেম্বর) সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা রয়েছে।
পরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখ, নিয়মকানুন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখতে হবে।
ফরম পূরণ ও প্রশ্নপত্র তৈরির সম্ভাব্য সময়সূচি
পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি হিসেবে ফরম পূরণ এবং প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা করছে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী—
ফরম পূরণ শুরু: নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ।
ফরম পূরণের শেষ সময়: ৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে।
প্রশ্নপত্র প্রণয়ন: ১ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে।
পরীক্ষা শুরু: ২ ডিসেম্বর থেকে।
ফল প্রকাশের লক্ষ্য: ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে।
তবে ফরম পূরণের সময়সীমা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক নিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ফরম পূরণের সময়সীমা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কেন সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ?
গত ৩১ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূরক পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়া ঠেকাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ফলাফলে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এমন পরিস্থিতিতে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী শিক্ষার্থীরা পুরো শিক্ষাবর্ষ অপেক্ষা না করে অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য?
এ বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী।
প্রকাশিত ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অন্যদিকে, অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
ফলাফলের এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ বছর উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সবাই এ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। অকৃতকার্য বিষয়ের সংখ্যা এবং আগের বছরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের বৈধ রেজিস্ট্রেশনের শর্ত পূরণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের এখন কী করণীয়?
এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ফলাফল অনুযায়ী কতটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন, তা নিশ্চিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ বা ২০২৫ সালের পরীক্ষার্থী হলে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কিংবা বৈধ রেজিস্ট্রেশনের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
তৃতীয়ত, ফরম পূরণের সময়সীমা ও পরীক্ষার বিস্তারিত নির্দেশনা জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করতে হবে।
বিশেষ করে আগের বছরের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূরক পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করার কারণে যেসব শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাঁদের জন্য এটি নতুন সুযোগ হতে পারে।
তবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিষয়সংখ্যা, পূর্ববর্তী পরীক্ষার বছর এবং ২০২৬ সালের বৈধ রেজিস্ট্রেশনের শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নির্দেশনাগুলো ভালোভাবে পড়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।





