‘গল্পটা এখানেই শেষ নয়’—ফ্রান্স সমর্থকদের উদ্দেশে এমবাপ্পের খোলা চিঠি, এমবাপ্পের খোলা চিঠিতে বিশ্বকাপ ট্রফি না জেতার কষ্ট, গোল্ডেন বুটের গর্ব ও ফ্রান্স সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা তুলে ধরেছেন দলের অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের শেষ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর ফ্রান্সের সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন দলের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এমবাপ্পের খোলা চিঠিতে তিনি বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে না পারার হতাশা, সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পাওয়ার গর্ব এবং ভবিষ্যতে আবারও একসঙ্গে লড়াই করার প্রত্যয় তুলে ধরেছেন।
২০১৮ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। তবে ২০২২ ও ২০২৬ সালের সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপে ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি ও গোল্ডেন বুট জিতলেও সোনালি ট্রফি হাতে ওঠেনি। সেই অপূর্ণতার কথাই তিনি অকপটে জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিতে ফ্রান্সের অধিনায়ক বলেন, বিশ্বকাপের যাত্রা ছিল আবেগ, প্রচেষ্টা ও দেশের জার্সি পরার গর্বে ভরা। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ শেষ হলেও ফ্রান্স দলের পথচলা এখানেই থেমে যাচ্ছে না।
এক মাসের আবেগ ও ফ্রান্সের জার্সির গর্ব

চিঠির শুরুতে ফ্রান্সের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপজুড়ে দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য তিনি দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এমবাপ্পে জানান, এক মাসের এই যাত্রায় ছিল আবেগ, নিজেদের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা এবং ফ্রান্সের জার্সি গায়ে চাপানোর বিশেষ অনুভূতি। তাঁর ভাষায়, পুরো অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ।
তিনি আরও বলেন, দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে এমন আবেগ ছিল, যা তাদের মাঠে লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করেছে। একই আবেগ সমর্থকদের টেলিভিশনের সামনে কিংবা গ্যালারিতে বসে ফ্রান্সের পাশে থাকতে উৎসাহ দিয়েছে।
ফ্রান্সের অধিনায়কের মতে, বিশ্বকাপের এই গল্প শুধু খেলোয়াড়দের নয়। দল ও সমর্থকরা মিলেই সেই যাত্রা তৈরি করেছেন।
এমবাপ্পের খোলা চিঠিতে বিশ্বকাপ ট্রফির আক্ষেপ
এমবাপ্পের খোলা চিঠির সবচেয়ে আবেগপূর্ণ অংশ ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে না পারার হতাশা নিয়ে। তিনি স্বীকার করেন, দল হিসেবে ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরতে না পারার কষ্ট এখনো তাঁকে তাড়া করছে।
এমবাপ্পে বলেন, এই হতাশা আরও কিছুদিন থাকবে এবং তিনি তা লুকাতে চান না। ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পাওয়ায় তিনি গর্বিত হলেও বিশ্বকাপের ট্রফি জিততে পারলে সেই অর্জনের মূল্য আরও বেশি হতো।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলীয় অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। গোল্ডেন বুট একটি বড় স্বীকৃতি হলেও বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দের বিকল্প নয়—চিঠিতে সেই অনুভূতিই উঠে এসেছে।
সমর্থকদের আরও সুন্দর সমাপ্তি দেওয়ার প্রত্যাশা
ফ্রান্সের সমর্থকদের কাছে দলের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন এমবাপ্পে। তাঁর মতে, সমর্থকেরা হয়তো আরও সুন্দর একটি সমাপ্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।
তবে তিনি এটিও বলেন, একটি গল্প কোন পথে এগোবে, তা সব সময় খেলোয়াড়দের হাতে থাকে না। তা সত্ত্বেও ফ্রান্স দল নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এবং মাঠে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে।
এমবাপ্পের মতে, দল ট্রফি জিততে না পারলেও নিজেদের প্রচেষ্টা ও লড়াই নিয়ে গর্ব করতে পারে। কারণ খেলোয়াড়রা নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে ফ্রান্সের হয়ে খেলেছেন।
গোল্ডেন বুটের কৃতিত্ব পুরো দলের
নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে চাননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। বরং সতীর্থদের অবদানকে সামনে এনেছেন তিনি।
চিঠিতে তিনি সতীর্থদের দৌড়, পাস, পরিশ্রম এবং দলীয় চেতনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, দলের অন্য খেলোয়াড়দের সহযোগিতা ছাড়া এত গোল করা সম্ভব হতো না।
এমবাপ্পে বলেন, সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি যতটা তাঁর নিজের, ততটাই পুরো দলের। এই বক্তব্যে ফ্রান্স দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি তাঁর সম্মান প্রকাশ পেয়েছে।
ফুটবলে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের পেছনেও দলের ভূমিকা থাকে—এমবাপ্পের বক্তব্যে সেই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্ব পেয়েছে।
শৈশবের স্বপ্ন থেকে ফ্রান্সের অধিনায়ক
চিঠিতে নিজের শৈশবের স্বপ্ন ও ফ্রান্স দলের অধিনায়ক হওয়ার পথের কথাও স্মরণ করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ২৭ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।
এমবাপ্পে জানান, ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্ন ছিল অন্তত একবার বিশ্বকাপে খেলা। পরে সেই স্বপ্ন আরও বড় হয়—ফ্রান্সের জার্সি পরা এবং একসময় দেশের অধিনায়ক হওয়া।
তাঁর ভাষায়, এসব অর্জন একসময় তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। তাই ফ্রান্সের জার্সি পরার সুযোগকে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন।
দেশের হয়ে মাঠে নামা এবং অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বকে তিনি বিশেষ সম্মান ও সৌভাগ্য হিসেবে দেখেন।
কঠিন সময়েও পাশে থাকা সমর্থকদের ধন্যবাদ
ফ্রান্সের সমর্থকদের অবিচল সমর্থনের জন্যও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এমবাপ্পে। তিনি বলেন, সমর্থকেরা কখনো দলকে ছেড়ে যাননি এবং কঠিন সময়েও পাশে থেকেছেন।
গভীর রাত পর্যন্ত জেগে যারা ফ্রান্সের খেলা দেখেছেন এবং গ্যালারিতে উপস্থিত হয়ে দলকে উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
এমবাপ্পের খোলা চিঠিতে সমর্থকদের ভূমিকা শুধু দর্শক হিসেবে নয়, দলের যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও উঠে এসেছে।
ফ্রান্সের জার্সির প্রতি সমর্থকদের আবেগ ও বিশ্বাস খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছে বলেও তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
দিদিয়ের দেশম ও দলের সঙ্গে যুক্ত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা
ফ্রান্সের বিদায়ী কোচ দিদিয়ের দেশমকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন এমবাপ্পে। পাশাপাশি কোচিং স্টাফ এবং দলের সঙ্গে কাজ করা অন্য সব সদস্যের অবদানের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে শুধু খেলোয়াড়রাই নয়, কোচিং ও সহায়ক দলের সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমবাপ্পে তাঁর চিঠিতে সেই সম্মিলিত কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দলের প্রস্তুতি, মাঠের পরিকল্পনা এবং পুরো বিশ্বকাপ যাত্রায় যুক্ত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি ফ্রান্স দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের কথাও তুলে ধরেছেন।
‘গল্পটা এখনো শেষ হয়নি’
চিঠির শেষ অংশে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন এমবাপ্পে। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ শেষ হলেও ফ্রান্স দলের গল্প এখনো শেষ হয়নি।
সামনে আবার ম্যাচ আসবে এবং খেলোয়াড়রা আবারও একত্র হবেন। নতুন লক্ষ্য নিয়ে ফ্রান্স দল মাঠে ফিরবে—এমন প্রত্যয়ের কথাই তিনি জানিয়েছেন।
এমবাপ্পের মতে, ফুটবল শেষ পর্যন্ত একটি খেলা। তবে এই খেলাকে ঘিরে খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা যে আবেগ একসঙ্গে ভাগ করে নেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ফ্রান্স দল এখনো একসঙ্গে খেলছে এবং তাদের যাত্রা এখানেই শেষ নয়।
ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় স্বপ্ন বড়
২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী এমবাপ্পে পরবর্তী দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতলেও আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। তাই তাঁর চিঠিতে ব্যক্তিগত গৌরবের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যের অপূর্ণতাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার অবশ্যই গর্বের। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারলে সেই সাফল্যের অনুভূতি আরও গভীর হতো।
এ কারণেই এমবাপ্পের খোলা চিঠি শুধু ধন্যবাদ জানানোর বার্তা নয়; এটি বিশ্বকাপের হতাশা থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রত্যয়ও।
সামনে নতুন লড়াইয়ের অপেক্ষা
বিশ্বকাপের ফলাফল ফ্রান্সের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও এমবাপ্পে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা হারাননি। বরং তিনি সমর্থকদের সঙ্গে আবারও নতুন পথচলার বার্তা দিয়েছেন।
তাঁর চিঠির মূল বার্তা হলো—হতাশা থাকবে, কষ্টও থাকবে; তবে ফ্রান্স দলের গল্প শেষ হয়ে যায়নি।
আগামী ম্যাচগুলোতে আবারও একত্র হয়ে দেশের জন্য খেলবে দল। সমর্থকদের সঙ্গে সেই আবেগের বন্ধনও অটুট থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক।
এমবাপ্পের খোলা চিঠি বিশ্বকাপের পর ফ্রান্স দলের অনুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এতে যেমন ট্রফি জিততে না পারার কষ্ট রয়েছে, তেমনি রয়েছে গোল্ডেন বুট জয়ের গর্ব, সতীর্থদের প্রতি সম্মান এবং সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এমবাপ্পে ভবিষ্যতের জন্য আশার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ শেষ হলেও ফ্রান্স দলের পথচলা শেষ হয়নি।
ফুটবলের মাঠে সামনে আরও ম্যাচ আসবে, দল আবারও এক হবে এবং নতুন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাবে। তাই তাঁর শেষ বার্তাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—গল্পটা এখানেই শেষ নয়।





