হুতিদের অগ্রগতিতে ট্রাম্প-সালমানের সম্পর্কে টানাপোড়েন, হুতিদের হামলায় সৌদির সহায়তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান ও মার্কিন নীতিতে বাড়ছে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও সৌদি আরবের ওপর হামলা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও রিয়াদের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত নতুন সামরিক অভিযান শুরু করতে রাজি হননি। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে টানাপোড়েন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, ট্যাংকার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালিয়েছে তারা। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছেও তাদের অবস্থান শক্ত হয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথগুলোর একটি বাব আল-মান্দেব। ফলে ইয়েমেনের উপকূলে হুতিদের অগ্রগতি শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নয়, আঞ্চলিক নৌ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
হুতিদের অগ্রগতিতে সৌদির সামরিক সহায়তার আবেদন
হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। বিশেষ করে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে রিয়াদ। তবে ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার পথে রয়েছে। অর্থাৎ রিয়াদের নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি উপেক্ষা না করলেও সরাসরি নতুন মার্কিন বিমান অভিযান শুরু করার অবস্থান নেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সৌদি আরব একদিকে হুতিদের হামলার মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ পাচ্ছে না।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবের কাছে সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ চুক্তির বাস্তবায়নে কংগ্রেসের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সরবরাহের সময় লাগবে।
অর্থাৎ সৌদি আরবকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হলেও হুতিদের বর্তমান হামলার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মার্কিন বিমান হামলা চালানোর অনুরোধে সাড়া দেয়নি ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে টানাপোড়েন কেন বাড়ছে

ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে টানাপোড়েন মূলত সৌদি আরবের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা প্রত্যাশা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতির পার্থক্য থেকে নতুন করে সামনে এসেছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেছেন, সৌদি আরবকে এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের বরাত দিয়ে তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সৌদি আরব ঠিক কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের গোয়েন্দা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কারেন গিবসনের বক্তব্যও একই ধরনের উদ্বেগের দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিক্রিয়া সৌদি আরবের কাছে এমন বার্তা দিতে পারে যে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লেও সব পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিকভাবে পাশে নাও দাঁড়াতে পারে।
এগুলো বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন; তাই এগুলোকে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
ট্রাম্প কেন সরাসরি সামরিক অভিযানে যাচ্ছেন না
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে একাধিক চাপ রয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচনকে তাঁর সিদ্ধান্তের পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ও স্থাপনাগুলোর ওপরও চাপ রয়েছে। কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েক মাসের সামরিক অভিযানের ফলে মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ কমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপে তাই সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, কিন্তু নতুন বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এদিকে সৌদি আরবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি বড় দিক হলো এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা। তবে এ ধরনের বিমান দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করার মতো তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়; সম্ভাব্য সরবরাহে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
পুরোনো মতবিরোধেও নতুন মাত্রা
ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতবিরোধ হয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিল, সামরিক অভিযানের জন্য তারা মার্কিন যুদ্ধবিমানকে নিজেদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকালীন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তার জন্য করা একটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা ট্রাম্প বন্ধ করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিয়াদের পক্ষ থেকে তখন সতর্ক করা হয়েছিল, ওই পরিকল্পনা উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রত্যাশা এবং দুই দেশের আগের মতবিরোধ।
হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ
অন্যদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
একজন হুতি কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু সৌদি জাহাজ এবং যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা না করার বিষয়ে অবস্থানের কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও জানিয়েছেন, হুতিরা মার্কিন স্বার্থে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এই অবস্থান সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। তবে একই সময়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকায় রিয়াদের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুই প্রণালিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২২ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ফোনালাপেও বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ দিয়ে নিরাপদ ও বাধাহীন নৌ চলাচলের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে টানাপোড়েন কতটা বাড়বে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে হুতিদের সামরিক অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের ওপর হামলার মাত্রার ওপর।
রিয়াদ সরাসরি মার্কিন বিমান হামলা চাইলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সেই পথে যায়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে এবং সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ফলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক একদিকে অব্যাহত থাকলেও তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তার প্রশ্নে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-হুতি যোগাযোগও দেখাচ্ছে যে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল এবং ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রগতি—তিনটি বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে হুতিদের কর্মকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছে। হুতিদের হামলায় সৌদির সহায়তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান ও মার্কিন নীতিতে বাড়ছে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।





