হামাস নেতাদের সঙ্গে কেন গোপন বৈঠকে ট্রাম্পের জামাতা, ইসরায়েলের আপত্তির মধ্যে ৮ দেশ যৌথভাবে চাপ বাড়িয়েছে, নেতানিয়াহুও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
গাজা শান্তি পরিকল্পনা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে কুশনারের হামাস বৈঠক ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার মিসরের আল-আলামিনে হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা খলিল আল-হায়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভও অংশ নেন। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন করে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজতেই এই আলোচনা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামোর কয়েকটি ধারা প্রত্যাখ্যান করার পর এই কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় কুশনার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ কুশনারের হামাস বৈঠক?

কুশনারের হামাস বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে তৈরি হওয়া মতপার্থক্য। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত রোডম্যাপ এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে মধ্যস্থতামূলক আলোচনা চালাচ্ছে।
মিসরের আল-আলামিনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা খলিল আল-হায়া এবং ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ অংশ নেন। এর মাধ্যমে হামাসের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এই আলোচনার পর কুশনারের সামনে আরও আঞ্চলিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শান্তি প্রস্তাব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের আপত্তিতে কোথায় আটকে শান্তি পরিকল্পনা?
ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে ইসরায়েলের অবস্থানকে ঘিরে। নেতানিয়াহু মার্কিন-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামোর কয়েকটি ধারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এক ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নিজের কঠোর অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, হামাস পুরোপুরি অস্ত্র জমা না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরবে না। অর্থাৎ গাজায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি কমানো বা প্রত্যাহারের প্রশ্নে তিনি এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়টি রয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি অব্যাহত রয়েছে।
৮ দেশের যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের সমালোচনা
শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের সমালোচনা করেছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার আটটি দেশ। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন রোডম্যাপের উদ্যোগ আটকে গেলে গাজায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চলমান বৈশ্বিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হতে পারে।
এই যৌথ অবস্থান গাজা ইস্যুতে আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সম্মতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও সামনে এসেছে।
কুশনারের পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতা
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে আলোচনা করার পর কুশনারের সামনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। শান্তি প্রস্তাব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যেই এসব আলোচনা হওয়ার কথা।
বিশেষ করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ এবং ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
Reuters জানিয়েছে, কুশনার ও নিকোলাই ম্লাদেনভ মিসরে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
গাজা শান্তি পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত রোডম্যাপকে এগিয়ে নিতে হলে একাধিক পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। একদিকে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে ইসরায়েলের কঠোর দাবি রয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুশনারের হামাস বৈঠক কেবল একটি পৃথক বৈঠক নয়; এটি গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে পুনরায় সক্রিয় করার বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের আপত্তি এবং বাস্তবায়নের শর্তগুলো নিয়ে মতবিরোধ থাকায় পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে এবং হামাসও পরিকল্পনার বিষয়ে শর্তসাপেক্ষ অবস্থান জানিয়েছে।
এখন কুশনারের আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মিসরের সঙ্গে আলোচনা, হামাস নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার কোনো পথ খুঁজতে চাইছে।
তবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতির প্রশ্নে তিনি ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। হামাসের পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমান অবস্থান থেকে সরবে না—তার বক্তব্যে এমন অবস্থানই উঠে এসেছে।
অন্যদিকে আট দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করে সতর্ক করেছেন, শান্তি উদ্যোগ আটকে গেলে গাজায় স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে সামনে আলোচনার মূল বিষয় হবে—ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার শর্তগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কতটা সমঝোতা তৈরি করা সম্ভব হয়। সেই প্রক্রিয়ায় কুশনারের হামাস বৈঠক নতুন কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির পথ তৈরি করে কি না, সেটিই এখন নজরদারির বিষয়।
গাজা শান্তি পরিকল্পনা পুনরায় এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই কুশনারের সঙ্গে হামাস নেতাদের বৈঠক হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েল পরিকল্পনার কয়েকটি ধারায় আপত্তি জানিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে আটটি দেশ ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।
সব মিলিয়ে, কুশনারের হামাস বৈঠক গাজা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে নতুন আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতপার্থক্য দূর করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।





