এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (1)
নিউইয়র্ক সফর: প্রথম দিনে ১০ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর
News Photocard (18)
প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর
News Photocard (15)
কিলোমিটারপ্রতি যত বাড়ল বাসভাড়া
News Photocard (9)
বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন
News Photocard (3)
৩ দাবি মানলে ঢাকা শহরে আর ককটেল ফুটবে না : নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

অত্যাধুনিক হচ্ছে সংসদের সাউন্ড সিস্টেম

অত্যাধুনিক হচ্ছে সংসদের সাউন্ড সিস্টেম,  ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তিতে মাইক, অনুবাদ ও ভোটিং ব্যবস্থা বদলাবে।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বারবার মাইক বিকল, হেডফোনে শব্দ না পাওয়া, ভাষান্তর ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়া এবং শব্দযন্ত্রের ত্রুটিতে অধিবেশন স্থগিত হওয়ার মতো সমস্যার অবসানে সংসদের সাউন্ড সিস্টেম পুরোপুরি আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে অত্যাধুনিক ডিজিটাল সাউন্ড ও কনফারেন্স সিস্টেম স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের প্রথম অধিবেশন থেকেই নতুন ব্যবস্থা চালু হতে পারে।

নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সংসদের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে শুধু মাইক্রোফোন পরিবর্তন নয়, পুরো কনফারেন্স ব্যবস্থা, ডিজিটাল ভোটিং, ভাষান্তর, অডিও নিয়ন্ত্রণ, কেন্দ্রীয় সার্ভার ও সফটওয়্যার আধুনিক করা হবে।

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম কেন বদলানো হচ্ছে

জাতীয় সংসদের বর্তমান সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অধিবেশন চলাকালে মাইক্রোফোন কাজ না করা, হেডফোনে শব্দ না পাওয়া এবং ভাষান্তর ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এসব সমস্যার কারণে একাধিকবার অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিতও করতে হয়েছে। ফলে সংসদের নিয়মিত কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে পুরো প্রযুক্তি অবকাঠামো নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত সিস্টেমটি ২০২২ সালে স্থাপন করা হয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ তারযুক্ত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তারযুক্ত প্রযুক্তির পরিবর্তে ডিজিটাল ও তারবিহীন প্রযুক্তির দিকে চলে গেছে। এর ফলে বর্তমান ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে বিকল্প যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে।

আধুনিক ব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আসবে

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সংসদের সাউন্ড সিস্টেম কেবল শব্দ সম্প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংসদের পুরো কনফারেন্স প্রযুক্তিকে আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় থাকবে—

  • আধুনিক ডিজিটাল মাইক্রোফোন ও কনফারেন্স সিস্টেম
  • ডিজিটাল ভোটিং সুবিধা
  • সিমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন বা তাৎক্ষণিক ভাষান্তর ব্যবস্থা
  • উন্নত অডিও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • কেন্দ্রীয় সার্ভার
  • প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার
  • আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অন্যান্য কনফারেন্স সুবিধা

এর ফলে অধিবেশন পরিচালনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তি একই আধুনিক কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।

চার আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বিবেচনায়

নতুন সংসদের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের জন্য বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে চারটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বিবেচনায় রয়েছে।

বেলজিয়ামের টেলিভিক, জার্মানির ব্রহলার ও বোশ এবং চীনের টায়ডেন—এই চার ব্র্যান্ডের প্রযুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।

প্রযুক্তি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু সরঞ্জামের সক্ষমতা নয়, ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহারবান্ধব বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংসদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সুবিধার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

এরই মধ্যে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের সার্বিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তিগত উপস্থাপনা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডগুলোর বাস্তব মডিউল বা নমুনা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ব্র্যান্ড নির্বাচন করা হবে। এরপর শুরু হবে ক্রয়প্রক্রিয়া।

দুই ধরনের বাজেট পরিকল্পনা

নতুন সংসদের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনে দুটি বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে। একটি সাধারণ ডিজিটাল কনফারেন্স সিস্টেম। এ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে মাল্টিমিডিয়া সুবিধাসমৃদ্ধ সর্বাধুনিক সংসদীয় কনফারেন্স সিস্টেম স্থাপন করা হলে সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ কোন প্রযুক্তি ও সুবিধাসমৃদ্ধ ব্যবস্থা সংসদে স্থাপন করা হবে, তার ওপর প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ভর করবে।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি কালের কণ্ঠকে বলেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার এবার আন্তর্জাতিকমানের নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি বেছে নিতে চায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যাতে শব্দযন্ত্রের কারণে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সেটিই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

২০২৪ সালের ক্ষয়ক্ষতির পর সংস্কার

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সংসদ ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর হয়। এতে অধিবেশনকক্ষের সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বা এসআইএস এবং ভাষান্তর ব্যবস্থাসহ ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সে সময় নতুন ব্যবস্থা স্থাপনে প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে নতুন প্রকল্প গ্রহণ না করে বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় ধরে কারিগরি মূল্যায়ন, কেবলিং নেটওয়ার্ক পুনর্নির্মাণ, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং সফটওয়্যার সমন্বয়ের কাজ করেন।

প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা পুনরায় সচল করা হয়। কিন্তু এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আবার সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে কারিগরি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

প্রথম অধিবেশনে একাধিকবার সমস্যা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই মাইক্রোফোন কাজ না করায় স্পিকারের দায়িত্ব পালনের সময় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়।

শব্দযন্ত্রের সমস্যার কারণে ওই অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিতও করতে হয়েছিল। পরদিন হেডফোন ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

এরপর ৫ এপ্রিল আবারও একই ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এ ঘটনায় প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি রাখা হয়।

এ ধরনের ধারাবাহিক সমস্যার পর সংসদে সাউন্ড সিস্টেম কেনা ও স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, প্রযুক্তিগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল।

পরে বিষয়টি তদন্তে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সাউন্ড সিস্টেম আধুনিকায়নের সুপারিশ করে।

সংস্কারের পর বাজেট অধিবেশনে বড় সমস্যা হয়নি

প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পর পুরো সংসদের সাউন্ড সিস্টেম কিছুটা সংস্কার করা হয়। এর ফলে দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশনে আগের মতো বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা যায়নি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী জানান, প্রথম অধিবেশনের পর স্পিকার, প্রধান হুইপ এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় অধিবেশনকক্ষের ১৪টি স্পিকার পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটিও দূর করা হয়েছে। ফলে বাজেট অধিবেশন, বিশেষ করে বাজেট উপস্থাপনের দিন কোনো প্রযুক্তিগত বিভ্রাট হয়নি।

তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় এখনো ঝুঁকি রয়েছে। নতুন সিস্টেম চালু হলে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সামনে পুরো ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

বর্তমান সিস্টেম মেরামত করে সচল রাখা গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কেবল পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বিশেষ করে সেন্ট্রাল কন্ট্রোল ইউনিট, পাওয়ার সাপ্লাই এবং কনফারেন্স কন্ট্রোল মডিউলের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের বিকল্প না থাকায় ভবিষ্যতে পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ কারণেই ডিজিটাল ও আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে শব্দ, ভাষান্তর, কনফারেন্স নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল ভোটিংসহ সংসদের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধা একই আধুনিক অবকাঠামোর আওতায় আসবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চূড়ান্ত ব্র্যান্ড নির্বাচন এবং ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ এগিয়ে যাবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছরের প্রথম অধিবেশন থেকেই নতুন সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বারবার দেখা দেওয়া শব্দযন্ত্র ও ভাষান্তর ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে পুরো প্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শুধু মাইক্রোফোন পরিবর্তন নয়, কনফারেন্স সিস্টেম, ডিজিটাল ভোটিং, ভাষান্তর, অডিও নিয়ন্ত্রণ, সার্ভার ও সফটওয়্যারও আধুনিক করা হবে।

সর্বোচ্চ ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাব্য এই উদ্যোগে কোন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তা প্রধানমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার পর চূড়ান্ত হবে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে সংসদের অধিবেশন পরিচালনায় বিদ্যমান প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সর্বাধিক পঠিত