আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
অস্ট্রেলিয়া গমনেচ্ছুদের জন্য ঢাকাস্থ হাইকমিশনের বিশেষ সতর্কবার্তা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
ভরা মৌসুমেও পাতে উঠছে না ইলিশ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (30)
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ২ বছর: রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের কাজ এগোয়নি

প্রশাসক বসছে ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে

প্রশাসক বসছে ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রশাসক নিয়োগ, আমানত ফেরত ও ঋণ আদায়ের পরিকল্পনায় ব্যক্তি আমানতকারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ পাঁচটি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়েছে। পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) চুক্তি বাতিল এবং সরকারি তদারকিতে প্রশাসক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, পিপলস লিজিং ছাড়া বাকি চার প্রতিষ্ঠানে রবিবারই প্রশাসক নিয়োগ হতে পারে। পিপলস লিজিংয়ের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা ও মামলাসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে।

পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত কেন

দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারা এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হারও অত্যন্ত বেশি।

বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—

  • পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
  • ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
  • আভিভা ফাইন্যান্স
  • এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট
  • ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। পিপলস লিজিংয়ের আইনি জটিলতিও দ্রুত নিষ্পত্তির আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

প্রশাসক নিয়োগে কী হবে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে চারটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পিপলস লিজিংয়ে আদালতের আদেশ পাওয়ার পর প্রশাসক বসানো হবে।

প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সরকারি তদারকির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত এবং এমডিদের চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মোট নয়টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে উন্নতি করতে ব্যর্থ হলে সেগুলোও রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় যাবে।

পাঁচ প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের চিত্র

পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পেছনে বড় কারণগুলোর একটি হলো এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল খেলাপি ঋণ। গত ডিসেম্বর শেষে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

প্রতিষ্ঠানভেদে খেলাপি ঋণের হার হলো—

  • এফএএস ফাইন্যান্স: ৯৯.৯৯ শতাংশ
  • ফারইস্ট ফাইন্যান্স: ৯৮.৫০ শতাংশ
  • আভিভা ফাইন্যান্স: ৯৩.৯৩ শতাংশ
  • পিপলস লিজিং: প্রায় ৯৫ শতাংশ
  • ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৯৯.৪৪ শতাংশ

অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপোর্টফোলিওর বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

পি কে হালদারের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের সঙ্গে পি কে হালদারের নামও জড়িত। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের, বর্তমানে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ম ও ঋণখেলাপির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও।

আমানতের পরিমাণ কত

বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ১৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা

প্রতিষ্ঠানভেদে আমানতের পরিমাণ হলো—

প্রতিষ্ঠানমোট আমানত
পিপলস লিজিং৩,৫৯৩ কোটি টাকা
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং৩,০১২ কোটি টাকা
আভিভা ফাইন্যান্স৫,৩৬৮ কোটি টাকা
এফএএস ফাইন্যান্স১,২৪৬ কোটি টাকা
ফারইস্ট ফাইন্যান্স৪৪৯ কোটি টাকা

এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সরকারি সহায়তার ভিত্তিতে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ অগ্রাধিকার দিয়ে ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আমানতকারীরা কীভাবে টাকা ফেরত পাবেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকার থেকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে একজন ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পেতে পারেন। তবে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।

বর্তমান নিয়মে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়ন হলে আমানতকারীর জমার পরিমাণ যতই হোক, আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে দুই লাখ টাকা দেওয়ার পর সরকারি তহবিল পাওয়ার ভিত্তিতে এক বা দুই মাস পরপর অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করা হবে। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় অথবা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে আনুপাতিক হারে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান। শিগগিরই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পিপলস লিজিংয়ের আইনি জটিলতা দ্রুত সমাধানের আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক লিকুইডেশন বা অবসায়ন আইন অনুসরণ করে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ও আর্থিক খাতসংক্রান্ত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যসূত্র দেখা যেতে পারে।

আরও চার প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের মে মাসে আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ ২০টি এনবিএফআইয়ের নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেয়। তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়, কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না।

পরবর্তী সময়ে ২০টির মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে প্রথম ধাপে বন্ধের জন্য বেছে নেওয়া হয়। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক ছিল না।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নয়টির মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। বাকি চারটিকে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।

এই চার প্রতিষ্ঠান হলো—

  • প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড
  • জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড
  • বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি)
  • প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড

এই চার প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাইম ফাইন্যান্সে ৬৩৫ কোটি, জিএসপি ফাইন্যান্সে ২৬০ কোটি, বিআইএফসিতে ৫৪০ কোটি এবং প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৯৭৬ কোটি টাকা রয়েছে।

সময়ের মধ্যে উন্নতি না হলে কী হবে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিন মাস সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় চলে যাবে।

অর্থাৎ, পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার বর্তমান সিদ্ধান্তের বাইরে থাকা এই চার প্রতিষ্ঠানও ভবিষ্যতে অবসায়নের আওতায় আসতে পারে, যদি তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক উন্নতি করতে না পারে।

আমানতকারীদের জন্য সিদ্ধান্তের গুরুত্ব

পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে মোট ১৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা আমানত থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ফেরতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারি সহায়তা, প্রশাসক নিয়োগ, ঋণ আদায় এবং সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ধাপে ধাপে অর্থ ফেরতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে অবসায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত থাকবে।

দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার পর পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রশাসক নিয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তি আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থ ফেরতের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার সরকারি সহায়তা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে। তবে পুরো অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রির ওপরও নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে তিন মাস সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত