দিল্লিতে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যানের ব্যাগ থেকে ৩১ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের পর শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে তদন্তে উঠে এসেছে গুরুতর প্রশ্ন।
আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যাগে ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি পাওয়ার ঘটনায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় এক মাস আগে ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া ও মেয়ে নুসরাত জুবাইরাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার পর ভারতের নয়াদিল্লিতে তার ব্যাগ থেকে এসব গুলি পাওয়া যায়। পরে ঘটনাটি নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্ত করে। তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের কর্মীদের দায়িত্ব পালনে নিয়ম লঙ্ঘন এবং অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে তদন্তে দায়িত্বে অবহেলা এবং যথাযথ প্রটোকল ও নিরাপত্তা তল্লাশি অনুসরণ না করার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আশিয়ান গ্রুপ চেয়ারম্যানের ব্যাগে গুলি: কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করেন। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের BG-397 ফ্লাইটে দিল্লি যাওয়ার জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, তার ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া এবং মেয়ে নুসরাত জুবাইরা বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন। এরপর তারা চেক-ইনের জন্য ডি লাইনে যান।
চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর তারা ফাইনাল নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য C-01 বোর্ডিং ব্রিজে যান। এই পর্যায়েই ব্যাগ স্ক্রিনিংয়ের বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, দুইজন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মী বাইরে থেকে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ও তার সন্তানদের ‘অবৈধ প্রটোকল’-এর মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রবেশ করান। অর্থাৎ, বিমানবন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে বিশেষ ব্যবস্থার অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ে কী ঘটেছিল
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল ব্যাগ স্ক্রিনিংয়ের সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ভূমিকা।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যাগ স্ক্রিনিংয়ের সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মনিটরের দিকে নজর রাখার পরিবর্তে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং করমর্দন করেন।
নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে মনিটর পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার এমন আচরণ তদন্ত প্রতিবেদনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার একটি বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এই পর্যায়েই ব্যাগের ভেতরে থাকা ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পরে ভারতের নয়াদিল্লিতে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যাগে ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি পাওয়া যায়। এর ফলে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ও ব্যাগেজের নিরাপত্তা তল্লাশি কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়।
তদন্তে বিমানবন্দর ও বিমানের কর্মীদের ভূমিকা
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও অবহেলার বিষয় উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাত্রীদের বিমানবন্দরে প্রবেশের প্রক্রিয়া এবং পরে ব্যাগেজ স্ক্রিনিং—দুই পর্যায়েই নিয়ম অনুসরণের ঘাটতি ছিল।
বিশেষ করে, ‘অবৈধ প্রটোকল’-এর মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রবেশ এবং নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মনিটরের পরিবর্তে যাত্রীর সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুই ঘটনা একই নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার ভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়ম ও প্রটোকল বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা হয়নি
প্রাথমিক তদন্তে অবহেলার বিষয় উঠে এলেও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগীব সামাদ বলেছেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তদন্তে যারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন এবং যথাযথ প্রটোকল ও নিরাপত্তা তল্লাশি অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের সুপারিশের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
বিমান নিরাপত্তার নিয়ম নিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকাশিত ব্যাগেজ নীতিতে নিরাপত্তা ও নিষিদ্ধ সামগ্রীর বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেবিন ব্যাগেজে বহনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে এবং অনুমোদন ছাড়া এসব সামগ্রী নিরাপত্তা স্ক্রিনিং পয়েন্টে নিয়ে আসাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, আশিয়ান গ্রুপ চেয়ারম্যানের ব্যাগে গুলি পাওয়ার ঘটনা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশি প্রক্রিয়া বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তার বাইরে কোনো অতিরিক্ত কারণ বা ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হচ্ছে না।
নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
ঘটনাটি নিয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার সঙ্গে যোগাযোগ করে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে তার ব্যাগে থাকা ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি কীভাবে দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছেছিল—এ বিষয়ে তার পক্ষের কোনো ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে নেই।
একইভাবে, দিল্লিতে গুলি উদ্ধারের পর সেখানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কেও প্রদত্ত সংবাদে বিস্তারিত তথ্য নেই। তাই এ বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো তথ্য অনুমান করা হচ্ছে না।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
আশিয়ান গ্রুপ চেয়ারম্যানের ব্যাগে গুলি উদ্ধারের ঘটনাটি শুধু একটি নির্দিষ্ট যাত্রীর ব্যাগে নিষিদ্ধ সামগ্রী পাওয়ার ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তের বিষয় হিসেবেও সামনে এসেছে।
কারণ, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে যাত্রী প্রবেশ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিরাপত্তা স্ক্রিনিং পর্যন্ত একাধিক পর্যায়ে নিয়ম অনুসরণের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা তল্লাশির সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মনিটর পর্যবেক্ষণ না করার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছে। তদন্তে সুপারিশ করা ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়িত্ব ও প্রটোকল অনুসরণের বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
ঘটনাটির সময়রেখা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির সময়রেখা সংক্ষেপে এমন—
- ১৬ জুলাই: মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া ও মেয়ে নুসরাত জুবাইরাকে নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন।
- দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট: তারা বিমানবন্দরে প্রবেশ করে BG-397 ফ্লাইটে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
- চেক-ইন: তারা ডি লাইনে চেক-ইন সম্পন্ন করেন।
- ইমিগ্রেশন: প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
- ফাইনাল স্ক্রিনিং: তারা C-01 বোর্ডিং ব্রিজে নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য যান।
- পরবর্তী সময়ে দিল্লি: নয়াদিল্লিতে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যাগে ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি পাওয়া যায়।
- পরবর্তীতে ঢাকা: শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে।
- তদন্তের ফল: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও অবহেলার বিষয় উঠে আসে।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগীব সামাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্বে অবহেলা, যথাযথ প্রটোকল অনুসরণে ব্যর্থতা এবং নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে যারা দায়ী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
তবে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা প্রদত্ত তথ্যে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।
আশিয়ান গ্রুপ চেয়ারম্যানের ব্যাগে গুলি পাওয়ার ঘটনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। নয়াদিল্লিতে ৩১ রাউন্ড জীবন্ত গুলি উদ্ধারের পর ঢাকায় করা প্রাথমিক তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং নিয়ম না মানার বিষয় উঠে এসেছে।
বিশেষ করে ‘অবৈধ প্রটোকল’-এর মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রবেশ এবং ব্যাগ স্ক্রিনিংয়ের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আচরণ তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকলেও এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে, ঘটনাটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।





