ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তেজনা, ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্ক জোরদারে ২০ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেন ম্যাক্রোঁ ও কার্নি। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যে নতুন অংশীদারিত্বের ঘোষণা আসে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলের ভূখণ্ড সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনে ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। বৈঠকে দুই নেতা প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কানাডার চলমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর আলাদা কূটনৈতিক গুরুত্বও তৈরি হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও জানিয়েছে, দুই নেতা নিরাপত্তা, স্থিতিস্থাপকতা ও সমৃদ্ধি জোরদারে দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরটি ছিল ২০১৪ সালের পর কোনো ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রথম সেন্ট পিয়ের ও মিকেলন সফর। একই সঙ্গে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী এই ফরাসি ভূখণ্ড সফর করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্ক জোরদারে নতুন ঘোষণা

বৈঠকের পর দুই নেতা প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, দুই মিত্র দেশ মহাকাশ, জলবায়ু ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ক্ষয় এবং সার্বভৌমত্বের ওপর নতুন ধরনের হুমকি—এসব পরিবর্তিত পরিস্থিতি দুই দেশের সমাজকে নতুন সংকটের মুখোমুখি করছে। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ও কানাডার মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্ত করার সময় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতা ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করেন। এর মধ্যে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দুই দেশের মধ্যকার সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয় রয়েছে।
বৈঠকের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা
ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্ক নিয়ে এই নতুন উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন চলছে।
উৎস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে কানাডাসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে মার্কিন পতাকার রঙে দেখানো হয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্ক কার্নি ও ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনে বৈঠক করেন। রয়টার্সও বৈঠকটির পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং ট্রাম্পের ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
তবে বৈঠকে দুই দেশের নেতারা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান ঘোষণা করেননি। বরং তাঁদের বক্তব্যে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক আইন, মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্য এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে কানাডার ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে। সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনের বৈঠকও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
মার্ক কার্নি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কানাডা ও ফ্রান্সের পাশাপাশি কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে দুই পক্ষের অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি উঠে আসে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজ্ঞানের ভূমিকা—এসব বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মিল রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপরও গুরুত্ব দেন।
সরকারি কানাডীয় তথ্যেও বলা হয়েছে, কার্নি ও ম্যাক্রোঁ কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা
ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্কের নতুন পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। দুই দেশের নেতা নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
বৈঠকের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, দুই দেশের মহাকাশ সংস্থা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতকে যৌথ মহাকাশ অবকাঠামো তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মহাকাশ উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং মাটিতে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর মতো বিষয় রয়েছে।
এর ফলে দুই দেশের সহযোগিতা শুধু প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি, মহাকাশ ও নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতেও বিস্তৃত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি, মহাকাশ ও বাণিজ্যে সহযোগিতা
বৈঠকে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। উৎস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ জ্বালানি ও বাণিজ্য খাতে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার ঘোষণা দিয়েছে।
এর পাশাপাশি মহাকাশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও সুপারকম্পিউটিংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করেছেন।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে বৈঠকে ঘোষিত সহযোগিতার কতটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে উৎস প্রতিবেদনে বিস্তারিত সময়সূচি দেওয়া হয়নি।
সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনের প্রতীকী গুরুত্ব
সেন্ট পিয়ের ও মিকেলনে বৈঠকের স্থান নির্বাচনও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কানাডার আটলান্টিক উপকূলের কাছে অবস্থিত একটি ফরাসি ভূখণ্ড। ফলে ইউরোপীয় একটি দেশের সঙ্গে কানাডার সরাসরি ভৌগোলিক নৈকট্যের একটি বিশেষ প্রতীকী মাত্রা এই বৈঠকে যুক্ত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের মাধ্যমে দুই নেতা জলবায়ু, জ্বালানি, মহাকাশ ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের কথাও তুলে ধরেছেন।
এই দিক থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠককে শুধু দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবেও দেখা যায়।
সামনে ফ্রান্স-কানাডা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
ম্যাক্রোঁ ও কার্নির বৈঠকের মূল বার্তা ছিল—পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশ নিজেদের সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করতে চায়। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য, মহাকাশ ও জলবায়ু—একাধিক খাতে এই অংশীদারিত্ব বিস্তারের কথা এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার চলমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার সময়েই এই ঘোষণা আসায় বৈঠকটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক গভীর করার প্রচেষ্টাও চলমান রয়েছে।
তবে এই বৈঠকের ঘোষণাগুলোকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দিতে পরবর্তী পর্যায়ে কী ধরনের চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা বা যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপাতত ২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠক থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে ফ্রান্স ও কানাডা নিজেদের মধ্যকার সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে।





